মঙ্গলবার, ২৯ জুলাই, ২০২৫

সুজয় চক্রবর্তীর গল্প : অসুখ



'ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম তখন, বুঝলে, ভুল।' গতকাল আমাকে এই কথা বলেছে রত্না। আজ সাত বছর পর।

রত্নাকে আমি সেই ছোটবেলা থেকেই চিনতাম। ও তখন ফ্রক পড়তো। তারপর তো চুড়িদার, শাড়ি। বলা যায়, রত্না আমার সামনেই যুবতী হল ! ও যখন ক্লাস সিক্স , আমি তখন এগারো ক্লাসের আর্টসের ছাত্র। ও যখন বাংলায় অনার্স নিল, আমি তখন চুটিয়ে টিউশনি করছি। একই পাড়াতে থাকতাম। দুতরফেই যাওয়া-আসা ছিল। 'দাদা' বলে ডাকতো।

শুধু আমার না, বয়সে আমার বোনের চেয়েও ছোট রত্না। বোন এম.এ পাশ করলো যে বছর, রত্না তখন সেকেন্ড ইয়ার, বাংলা অনার্স।  কিন্তু সে যে আমাকে নিয়ে 'অন্য' কিছু ভেবে ফেলেছিল, তা জানতাম না। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে ফুলস্কেপ কাগজে প্রায় চার পাতার এক চিঠি লিখেছিল, আমাকে দেবে বলে। চিঠিটা পাঠিয়েছিল নিবেদিতাকে দিয়ে। নিবেদিতা আমার বোন। কাকুর মেয়ে। চিঠিটা পড়ার পর আমি তো রীতিমতো অবাক ! মেয়েটা বলে কি ! এতোটা ভালোবাসে আমাকে !

ঠিক করলাম, ওর সঙ্গে কথা বলা দরকার। সামনাসামনি কথা বললে লজ্জা পেতে পারে ভেবে ওকে ফোনে ধরলাম। বললাম, 'রত্না, টিউশনি আজ আছে, কাল নেই। আমি একপ্রকার বেকারই বলা চলে। আগে নিজের পায়ে দাঁড়াই, তারপর এ নিয়ে ভাববো। তাছাড়া বেকার ছেলের হাতে তোমার মা-বাবা কি তোমাকে তুলে দেবেন ? '

একটু এগিয়ে ভেবে ফেলেছিল রত্না।  জবাবে বলেছিল, ' টিটুদা, দুজনে মিলে একটা সংসার টেনে নিয়ে যেতে পারবো না ! আর বাড়ির ব্যাপারটা আমার ওপরেই ছেড়ে দিতে পারো। তুমি রাজি কিনা তাই  বলো? '

আমি এ প্রান্তে কি বলবো তখন ভেবে পাচ্ছি না। এ জাতীয় ঘটনা যে কোনও দিন আমার জীবনে  ঘটবে, ভাবিনি। চুপ মেরে রয়েছি দেখে রত্নাই মুখ খুললো, ' আপত্তি থাকলে ব'লো। যদি তোমাকে নাও পাই, আমার কোনও আপশোস থাকবে না, টিটুদা। ভেতরের কথাটা যে তোমাকে জানাতে পেরেছি, সেই যথেষ্ট।'

একদম ঠিক । কম মেয়েই সেটা  পারে। ওর এই স্পিরিটটা বরাবরই ঈর্শনীয়। এতটুকু ভনিতা নেই। ছেলেরা যদি 'আই লাভ ইউ' বলতে পারে, মেয়েরা কেন পারবে না ! তাদেরও তো পছন্দ-অপছন্দ আছে ! ভালো লাগা, মন্দ লাগা আছে ! আর কেন জানি না, ওর এই জিনিসটাই হঠাৎ আমারও ভালো লেগে গেল ! তাছাড়া অপছন্দ হওয়ার মতো দেখতে ও ছিল না। তাই শুধু ও না, আমিও ওর প্রেমে পড়ে গেলাম । দৃষ্টি ভঙ্গির পরিবর্তন করলাম সেদিন থেকেই। ইতিমধ্যে আমার ভেতরেও যে একটা ঝড় বইতে শুরু করেছে, টের পাচ্ছিলাম।

রত্না ওর বাড়িতে বরাবরই স্বাধীনতা পেয়ে এসেছে। তাই কোনও অসুবিধা হল না ওর। সবাইকে দিব্যি ম্যানেজ করে নিল। বেগ পেতে হল আমাকে। যথেষ্টই । রত্নার চার পাতার চিঠির কথা আমার বাড়ির কেউ জানতে বাকি থাকলো না। পরিবারের সদস্য হয়েও আমি যেন তখন পড়শী বাড়ির ছেলে ! সবাই একদিকে আর আমি আরেক দিকে। বাড়ির মতে, এমন 'নির্লজ্জ' মেয়েকে কিছুতেই ঘরের বউ করা যায় না। এই যদি কালচার হয়, তো সংসার দুদিনেও টিকবে না৷ আমার তখন গলায় আঙুল দিয়ে বমি করার মতো অবস্থা।

এরমধ্যেই কাকতালীয়ভাবে চাকরিটা পেয়ে গেলাম। বন্ধু সঞ্জীবের আনুকূল্যে। প্রাইভেট কোম্পানি। কিন্তু ধীরে ধীরে বেতন বাড়বে। খবরটা জেনে রত্না আর দেরি করতে চাইলো না। আমিও আর অন্য কিছু ভাবিনি। চাকরিতে জয়েন করেই ওর ভালোবাসার দাম দিলাম ওকে বিয়ে করে। বাড়ির অমতেই।

আজ সেই বিয়ের সাত বছর পূর্ণ হল। পাক্কা সাত বছর। মনে আছে, ছোয়াছুয়ির আড়ষ্টতা প্রথম দিনই ভেঙে দিয়ে আমার হাতে হাত রেখে রত্না বলেছিল, 'দেখবে আমরা ঠিক চালিয়ে নিতে পারবো, টিটুদা। কোনও অসুবিধা হবে না।'

বিয়ের পর বাড়ি ছেড়ে চলে এলাম শ্রদ্ধানন্দ পার্কের ভাড়া বাড়িতে। তারপর তো পুরোদস্তুর সংসারী হয়ে উঠলাম। একটা সময় টিভি, ফ্রিজ, ওয়াসিং মেসিন সবই কিনে ফেললাম ইন্সটলমেন্টে। এখনও শোধ করছি সেসব। টুনাটুনির সংসারে হাসি, আনন্দে দিব্যি চলে যেতে লাগলো দিনগুলো ।

বিয়ের বছর দুয়েকের মাথায় রত্নার কোল আলো করে এলো গুবলু ৷ আমাদের একমাত্র ছেলে। আজ তার পাঁচ বছর হল। রত্না আর বাচ্চাকাচ্চা চায় না। একটাকেই ও মানুষের মতো মানুষ করে তুলতে চায়। আমারও তাতে সায় আছে । মাসে যা হাতে পাই তাতে মোটামুটিভাবে সংসারটা চলে যায় । ও বলেছিল, 'জব' করবে। আমিই বাধ সেধেছি। না খেয়ে তো আর নেই !

এতদিন সত্যিই কোনও অসুবিধা  হয়নি। ঠিক চালিয়ে নিচ্ছিলাম। কিন্তু এখন টের পাচ্ছি । একটা সংকট প্রকট হয়ে উঠছে ক্রমশ। ব্যাপারটা যে আর্থিক, বলাইবাহুল্য।  আমাদের এই পাড়াটাতে গুবলুর বয়সী প্রায় সব বাচ্চাই ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে। গাড়ি এসে বাড়ির দোরগোড়া থেকে ওদের নিয়ে যায়। স্কুল বাস। রত্নারও ইচ্ছে গুবলু ঐ বাসে করে স্কুলে যাবে। অর্থাৎ ছেলেকে সেও ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াবে ঠিক করেছে। এই সেশনেই। কিন্তু সেসব প্রথমে আমাকে বলেনি। যখন ভর্তির ফর্ম নিয়ে এলো বাড়িতে, তখন জানতে পারলাম। বললাম, 'রত্না, এটা আমাকে বলতে পারতে। ছেলেটাতো আমারও নাকি! '

আমি যে অখুশি, তা বুঝতে পেরে রত্না বললো, 'আরে, তোমাকে বলবো বলবো করেও সময় হয়ে ওঠেনি। তাছাড়া তুমি বাড়ি থাকো কতক্ষণ?'  

------ সে না হয় দিনের বেলা। রাতের দিকে তো বাড়িই থাকি ! 

------ আচ্ছা বাবা, ভুল হয়েছে। এবার ছাড়ো।

বোঝালাম অনেক। 'রত্না, ওখানে দিলে ছেলে না বাংলা, না ইংরেজি কোনওটাই ভালো করে শিখবে না। তারচেয়ে বাংলা মিডিয়ামেই থাক না! সিক্স-সেভেন পর্যন্ত আমরাই ওকে পড়াতে পারবো। টিউটর লাগবে না। তাছাড়া আমরাও তো বাংলা মিডিয়ামেই পড়েছি! '

---- হুঁ, জানতাম এটাই বলবে। তোমার জ্ঞানের কথা রাখো। আজ পর্যন্ত আমার কোন শখ-আহ্লাদটা তুমি পূরণ করেছো, বলতে পারো?  ছেলেটাকে যে একটা ভালো স্কুলে পড়াবো, তাতেও তোমার আপত্তি! পকেটের জোর তোমার কোনও কালেও হবে না।


আমি সহজে রাগী না। রাগলে দেখেছি, তাতে ফল ভালো দেয় না। তাই ঠান্ডা মাথায় ওকে বললাম, 'রত্না, আমাদের স্ট্যাটাস আর ওদের স্ট্যাটাস এক না। একটা প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করে একজন কতো কি করতে পারে, বলো তো? '

---- তাই বলে ছেলের ভবিষ্যতের কথা ভাববো না!

----- অবশ্যই ভাববে। কিন্তু সাধ আর সাধ্যের ফারাকটাও তো বুঝবে।

 ---- আমার অতো ফারাক বুঝে কাজ নেই। এতো দিন অনেক বুঝেছি। জীবনে তো কোনও শখ-আহ্লাদই মিটলো না!

আমি আর কথা বাড়ায়নি। চুপ করে গেলাম। একসময় রত্নাও দেখি চুপ মেরে গেল। ঘটনার পর টানা দুদিন রত্না আমার সঙ্গে কোনও কথা বললো না।


তারপর পরিবেশ যখন একটু শান্ত হল, একপ্রকার জোর করেই গুবলুকে আমাদের পাড়ার প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলাম । বাস-টাসের ব্যাপার নেই। পিঠে ব্যাগ নিয়ে পায়ে হেঁটেই হেলতেদুলতে স্কুলে যায় গুবলু। ওকে পেছন থেকে দেখলে আমার ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যায়। কখনও রত্না, কখনও আমি ওকে স্কুলে দিয়ে আসি। রত্না এনিয়ে আর কিছু বলেনি।


কিন্তু ইদানিং খেয়াল করছি চারদেয়ালের মাঝে থাকলেও আমার সঙ্গে রত্না আর আগের মতো হেসে কথা বলে না । দুটো সুখ-দুখের গল্পও করে না! আমি বলতে গেলে এতটা উদাসীনভাবে থাকে যে, বাধ্য হয়ে আমাকে ঢোক গিলতে হয়। এমনকি দৈবাৎ ঘটে যাওয়া রাতের বিছানাতেও রত্না আগের মতো ঘোলাটে চাউনি নিয়ে আমার দিকে তাকায় না আর । গলদটা যে ঠিক কোথায়, ধরতে পারলেও কিছুই করার নেই আমার ।


ঘরে বউ-ছেলে নিয়ে থাকলেও মাঝেমধ্যেই আমার মনে হয় , আমি কি জীবনে আদৌ সুখী হতে পারলাম? এরকম কেন মনে হয়, বলে বোঝাতে পারবো না। কিন্তু হয়। সুখ নাকি স্বপ্নে ! কিন্তু মাঝেমাঝে যা স্বপ্ন দেখি তাতেও সুখী হওয়ার কোনও কারণ খুঁজে পাইনি। মরার মতো শুয়ে থাকি বিছানায়। ঘুম নেই চোখে । প্রায় রোজই এরমটা হয়। পাশের ঘরে রত্না আর গুবলু শুয়ে থাকে। ইচ্ছে হয় ওদের পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ি। কিন্তু পা বাড়াতে গিয়েও ভেতর থেকে কেমন যেন গুটিয়ে ফেলি নিজেকে।


আজ বাড়ি ফেরার পথে কি মনে হল হারুদার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে গেলাম। প্রায় পনেরো-ষোল বছর পর। চৌধুরী সুপার মার্কেটের পাশের ফুটপাতে হারুদা পুরনো বইপত্র নিয়ে বসে । অনেক দিন ধরে। সেখানে রান্নার বই থেকে শুরু করে স্পোকেন ইংলিশ, কামসূত্র, জোকস, নানা ধরনের বই রাখে । হারুদার সঙ্গে আমার আলাপ বহুদিন আগে । বই পড়ার সূত্রেই । যখন নাকের নিচে গোঁফের রেখা দেখা দিচ্ছে তখন থেকে। হারুদাকে পঞ্চাশ পয়সা দিলে হারুদা 'চাচা চৌধুরীর' বই পড়তে দিত সাতদিন ধরে । সাতদিন লাগতো না। একদিনেই শেষ করে আবার অন্য বইয়ের জন্য ছুটতাম হারুদার কাছে । হারুদা মুচকি হেসে পাতিয়ে রাখা পলিথিনের উপর থেকে আমার পছন্দের বইটি তুলে দিত হাতে ৷ এখনও হারুদা তেমনই আছে, শুধু বয়স বেড়েছে এই যা। 

 আজ দেখলাম ত্রিপলের উপরে নানান স্বাদের বই সাজানো। মাথা নিচু করে সেগুলো দেখছিলাম। হঠাৎ একটা বইয়ের দিকে চোখটা আটকে গেল ৷ মনে হল, এই বইটাই আমার দরকার। ভীষন রকম দরকার। কারণ বইটার নাম, ‘ বিবাহিত জীবনে সুখী হওয়ার উপায়।'


বইটা হাতে নিয়ে পাতা ওল্টাতে গিয়ে দেখলাম বড়ো বড়ো হরফে রিভার্স করে লেখা ---‘ কী করবেন, কী করবেন না ।‘ স্বামী-স্ত্রীকে লক্ষ্য করে কিছু টিপস দেওয়া আছে। যেমন : ছোটখাটো ব্যাপারেও মনোযোগ দিন , ঘ্যানর ঘ্যানর করবেন না , সঙ্গী বা সঙ্গীনীকে অধিকার করতে চাইবেন না , কাজের শেষে তাকে আন্তরিক প্রশংসা করুন ইত্যাদি ইত্যাদি ।

---- হারুদা, বইটার দাম কতো গো ?

---- দশ টাকা ।

টাকাটা দিয়ে বইটা অফিস ব্যাগে রাখতে যাবো , অমনি চোখ পড়লো উলটো দিকের ফুটপাতে ।

দুটো পিঠোপিঠি বাচ্চা খেলা করছে। খালি গা । দুটোই ছেলে হবে বোধহয়। পাশেই উনুনে ভাত চাপিয়েছে তাদের মা । বাবাটা একটা ইটের উপর বসে বিড়ি টানছে আর মা’র সঙ্গে গল্প করছে । ঝুপড়ি ঘরটার পাশে একটা রংচটা রিক্সা দাঁড় করানো। গল্প বলার ফাঁকে ফাঁকে শিমের বিচির মতো দাঁত বার করে বাবাটা হেসে উঠছে ৷ মা-ও ফিক করে হেসে আঁচল দিয়ে মুখ চাপা দিচ্ছে। মাঝেমাঝেই। ল্যাম্পপোষ্টের আবছা আলোতেও ওদের মুখগুলো বড় উজ্জ্বল দেখাচ্ছে ! 

মাথায় ছাদ নেই। গায়ে জামা নেই। পেটে খিদে নিয়েও দিব্যি 'সুখে' আছে মনে হল ওরা । হাতে ধরা বইটার দিকে চোখ পড়তেই ভাবলাম, বাবা লোকটা কি হারুদার এই বইটা পড়েছে? কি জানি । হয়তো পড়েও থাকতে পারে।

হারুদার দোকান ছেড়ে এখনও যাইনি। আঙুল দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলাম হারুদাকে, ' ঐ লোকটা কি তোমার দোকানে বইটই পড়তে আসে? '

---- ও? ও তো নবীন। লেখাপড়াই জানে না ! আঙুলে টিপছাপ দেয়। ও আবার কী পড়বে?

কথাটা শোনার পর আমি আর কথা বাড়ালাম না। শুধু বইটা পালটে একই দামের 'এসো টেন্স শিখি ' বইটা ব্যাগে পুরে বাড়ির দিকে পা বাড়ালাম। ওটা গুবলুর কাজে লাগবে।

ভাবছি, এখানে একবার রত্নাকেও আসা দরকার। 




                   --------------------------------------------------



রবিবার, ৬ জুলাই, ২০২৫

সুজয় চক্রবর্তীর গল্প : চক্রান্ত


হাসতে হাসতে চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে যেত মেয়েটার। সব কথাতেই একগাল হেসে কথা বলতো ও। ওকে কখনও মুখ কালো করে বসে থাকতে দেখেনি কেউ। আর ওর জন্যই তো স্কুলে ক্লাসের গোমড়ামুখোগুলোও না হেসে পারতো না। এখন সেই হাসিখুশি, মিষ্টি মুখের মেয়েটাই একদম চুপ! ভীষণ রকম চুপ। সে যেন হাসতেই ভুলে গেছে! 

থার্ড ইয়ারে পড়ার সময়ই বিয়েটা হয়ে গেল ওর। ওর মানে শেফালির। প্রেমটেম না, অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ। সম্বন্ধটা দিয়ে ছিল বিন্নি পিসি। একটাই তো পিসি ওর। পৈতৃক সম্পত্তি নিয়ে দাদার সঙ্গে মন কষাকষি চললেও শেফালিদের দুই বোনকে পিসি নিজের মেয়ের মতোই দেখে এসেছে। মেয়েটা ভালো ঘরে যাক, ভালো বর পাক, তিনি তো চাইবেনই! তাই শুধু সম্বন্ধই দিলো না বিন্নি পিসি, সঙ্গে সার্টিফিকেটও দিয়ে বসলো পাত্রের। কোনও নেশা নেই ছেলের। যেমন গুণ, তেমন তার রূপ! একটাই ছেলে। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। মাস পুরলে মোটা টাকা বেতন। বিয়ের বাজারে এমন ছেলের ডিমান্ড সবসময়। তাই শেফালির বাবাকে পিসি বলেছিল, 'দেরি করিস না দাদা। শুভ কাজ তাড়াতাড়ি হওয়াই ভালো।' ঝামেলা যাই হোক না কেন একমাত্র বোনকে প্রলয় দত্ত মানেও খুব। তাই ইঞ্জিনিয়ার পাত্রকে দত্ত বাড়ির বড়ো জামাই করে নিতে, দুবার ভাবলেন না তিনি। শেফালির বাবা। বিয়ে পাকা করে ফেললেন। 

কিন্তু এতো 'সকাল' 'সকাল' বিয়ে করার ইচ্ছে শেফালির মোটেও ছিল না। সে চেয়েছিল পড়াশোনা করে আগে নিজের পায়ে দাঁড়াতে । চেয়েছিল মা-বাবার ছেলের অভাব পূরণ করতে। 

মা শেফালিকে বোঝালো অনেক। বাবা গো ধরে বসে থাকলো।

----'এই পাত্রই শেফালির জন্য উপযুক্ত। আমার কোনও ছেলে নেই। দুটোই তো মেয়ে। তাই ভালো ঘরে, ভালো ছেলে দেখে মেয়ে দুটোর বিয়ে দিতে পারলেই নিশ্চিন্ত। পড়াশোনা সে যে করেনি, তা তো নয়! আর নিজের পায়ে দাঁড়ানো বললেই হল! এই বাজারে চাকরি? কত এম.এ, বি.এড ঘুরে বেড়াচ্ছে রাস্তাঘাটে। তাছাড়া বিয়ের বয়েস কি ওর হয়নি? '

শেফালি এখন ২৩। বিয়ের বয়স তার হয়েছে। এটা সেও জানে। মা'র যখন বিয়ে হয়, মা'র বয়স তখন ১৯ বছর। তাবোলে সেই সময়টার সঙ্গে এখন কি মেলানো ঠিক হবে? এখনও তো তার অন্য বন্ধুরা পড়াশোনা করছে! না, একথা বাবাকে সে বলতে পারেনি। সবটাই মনে মনে। শেষে একটা ক্ষীণ আশা দেখতে পেল হবু শ্বশুরের কথায়, 'বিয়ের পরেও চাইলে বউমা পড়াশোনা করতে পারে', এই আশ্বাসে রাজি হয়ে গেল সে। 

ঘটা করে বড়ো মেয়ের বিয়ে দিলেন প্রলয় দত্ত। পাত পেড়ে খেয়ে গেল আত্মীয়-বন্ধুরা। শুভেচ্ছা জানিয়ে গেল তাদের সংসার জীবনের। 

বরাবরই মিশুকে শেফালি। কি ছোট কি বড়। সবার সঙ্গেই ও খুব সহজেই মিশে যেতে পারে। কোনও ইগো নেই। ওর এই হাসিখুশি স্বভাবটার জন্যই পাড়াতে বড়ো প্রিয় ছিল সবার। শ্বশুরবাড়ির পাড়াতেও খুব অল্প দিনের মধ্যেই সে সকলের প্রিয় হয়ে উঠলো। 

দূর শিক্ষায় এম.এ তে ভর্তি হল শেফালি। বাংলায়। পলাশ চায়নি। চায়নি এই কারণেই, সে তো আর কোনও অভাব রাখেনি সংসারের! বউকে পড়াশোনা করিয়ে চাকরিতে পাঠাবে, এমন হালও তার হয়নি। তাছাড়া ঘরের বউ ইউনিভার্সিটির ঐ আঁতেল ছেলেগুলোর গা ঘেঁষে বসবে, এ তার সহ্য হবে না। আপত্তি ছিলো প্রচুর। এক প্রকার জেদ করেই পড়াটা আবার শুরু করলো শেফালি। 

কিন্তু শেফালির এই হেসে হেসে কথা বলাটা পলাশের একদম না-পসন্দ। সেই প্রথম দিন থেকেই। বিশেষ করে যখন পাড়ার কোনও পুরুষ মানুষের সঙ্গে শেফালি কথা বলতো, জ্বলে যেত পলাশের ভেতরটা। সে শুধু পলাশের। শুধু তার সঙ্গেই সে এভাবে কথা বলতে পারে। এই ভাবনাটা পলাশের ভেতরে গেঁথে ছিল। তাই মুখে কিছু না বললেও আকারেইঙ্গিতে বেশ কয়েকবার বুঝিয়েছে সেকথা। কখনও শেফালি বুঝতো, কখনও বুঝতো না। আসলে জন্মগত স্বভাবটা কি অত সহজে যায়! 

নানা কারণে শেফালিকে নিয়ে পলাশের ভেতরে একটা সংশয় কাজ করতো। দিনের পর দিন নানা অছিলায় তার প্রকাশ দেখা দিত  পলাশের আচরণে। শেফালি সাধ্যমতো চেষ্টা করতো, পলাশের  ভুলগুলো ধরিয়ে দেওয়ার, কিন্তু বার বার সে ব্যর্থ হতো। তখন বালিশে মুখ গুঁজে কান্না ছাড়া তার  আর কোনও উপায় থাকতো না।

ক্রমে শেফালি বুঝতে পারলো আসলে কাউকেই পলাশ বিশ্বাস করে না। সবসময় একটা সন্দেহ দানা বেঁধে থাকে তার মনে। পলাশের খালি মনে হয়, সারা দুনিয়া যেন ওর বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে। ঘোর চক্রান্ত। এখন সেই দলে ভিড়েছে শেফালিও!

শুধু বাড়িতেই নয়, অফিসেও সেই এক ব্যাপার! কলিগরাও বিষয়টা জানে। আর তাই আড়ালে তাকে নিয়ে হাসিঠাট্টাও করে। কেউ যদি কারও কানের কাছে মুখ নিয়ে আড়চোখে পলাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে কিছু বললো, অমনি পলাশ 'বুঝে' গেল, নিশ্চয় তার নামেই কিছু বলছে! 

প্রথম প্রথম শেফালি এসব জানতে পারেনি। সময় লেগেছে, অনেক পরে। আর যখন জানতে পারলো, সে রোগ তখন ছোঁয়াচে রোগের মতোই ছড়িয়ে পড়েছে পলাশের মগজে। 

ইদানিং পলাশের মনে হচ্ছে শেফালি নিশ্চয় তার কাছে কিছু লুকোচ্ছে। এই বয়সের মেয়ে পরপুরুষে মজে যেতে কতক্ষণ?  নাহলে সেদিনের ছোকরা দুলালের সঙ্গে তার এত কিসের কথা! কিসের এত ভাব! সে যখন বাড়ি থাকে না, এই দুলাল যে তাদের বাড়িতে আসে না কে বলতে পারে? তাই সে ঠিক করেছে বাড়িতে সিসি ক্যামেরা বসাবে। কল করেছিল গোবিন্দকে। আজ ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রি গোবিন্দ এসে ঘুরে গেছে। আপাতত চারটে লাগাবে। পুরো বাড়িটা ধরা না গেলেও বোঝা যাবে, বাড়িতে কে ঢুকছে, কে বেরোচ্ছে। পরে বাড়াবে। 

----- বুঝলে, কাল গোবিন্দ আসবে। এগুলো ওকে দেবে। 

পলাশের হাতে সিসিটিভি ক্যামেরার প্যাকেটগুলো দেখতে পেয়ে শেফালি বললো, ' এগুলো কেন  হঠাৎ? '

------ হঠাতের কি আছে, মা-বাবা অসুস্থ। বয়স হয়েছে। তুমি একা মেয়েমানুষ। কখন কি বিপদ হয়৷ বলা যায়? তাছাড়া পাড়ার ছেলেগুলোও খুব একটা সুবিধের  না। তোমাকে কতবার বারণ করেছি, ওদেরকে পাত্তা দিও না। ওদের সঙ্গে কথা বলার দরকার নেই। তুমি শুনলে তো! 

----- ও, এই ব্যাপার? সত্যি তোমার মানসিকতা যে এত নিচে নেমে গেছে, ভাবতে পারছি না, পলাশ! কি বলোতো, তোমার সঙ্গে রাত কাটানো যায়, কিন্তু সংসার করা যায় না, বুঝলে?'


ব্যস, আর কথা বাড়ায়নি শেফালি। 

শেফালির এখন খুব মনে পড়ছে বিন্নি পিসির কথা। তার দেওয়া 'সার্টিফিকেট' বাবা তখন লুফে নিয়েছিল। খোঁজও নেয়নি ছেলের।বিন্নি পিসি খালি জোর দিয়েছিল, 'মোটা টাকা'র উপরে। গাড়ি, বাড়ি, কারি কারি টাকা, সত্যিই এসব কিছু চায়নি শেফালি। চেয়েছিল একজন ভালো মনের মানুষকে। পায়নি। কাকে বলবে এসব! শুধু মাকে বলেছে। আর সব মায়েদের মতোই শেফালিকেও মা বলেছে,  'আরেকটু ধৈর্য ধর, মা। দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে।' না, কোনও কিছুও ঠিক হয়নি। 

শেফালিও ভেবেছিল, বাচ্চাকাচ্চা হয়ে গেলে পলাশ ঠিক চেঞ্জ হয়ে যাবে। ভুল ভেবেছিল। তুতুল আসার পরেও সেই একইরকম থেকে গেছে সে। আসলে শেফালি তাকে তখনও চেনেইনি।

অবশেষে একদিন সেই কঠিন সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেললো শেফালি। সেপারেশন । জাস্ট আর পারছে না সে। 

মামলা কোর্টে উঠলো৷ কিন্তু আদালত বিচ্ছেদ না করে দু-জনকে আলাদা থাকার পরামর্শ দিলো, যাতে নিজেদের ত্রুটিগুলো বুঝতে পেরে আবার একসঙ্গে তারা পথ চলতে পারে। শেফালি রাজিও হল। কিন্তু এক বছর আলাদা থাকার পরেও পলাশ যেখানে ছিলো, সেখানেই। একচুলও নড়েনি এদিকসেদিক! 

এখনও পলাশের সঙ্গে ডিভোর্সের মামলাটা ঝুলছে । পলাশ ডিভোর্স দিচ্ছে না। শেফালি তাহলে বাঁচে!  অনেক দিন হয়ে গেল শেফালি পলাশের মুখোমুখি হয়নি ।  মুখোমুখি হতে ও চায়ও না। সে অনেক চেষ্টা করেছিল পলাশকে শুধরে নেবার। পারেনি। জানে না, এ তার অক্ষমতা কি না। কিন্তু জোড়াতালি দিয়ে আর কতদিন চালানো যায়!

এখন শেফালির ঠিকানা '১০ এ ঘোষ পাড়া লেন, কলকাতা - ৩৬।' বাপের বাড়ি। একটা বাচ্চাদের স্কুলের দিদিমনি সে। অফ টাইমে প্রাইভেটও পড়াই। মা আর ছেলেতে থাকে। সে স্কুলে চলে গেলে তুতুলের দেখভালের দায়িত্ব পড়ে দাদু-দিদার উপর। কতক্ষণ আর ভালো লাগে দাদু-দিদার শাসন! তাই শেফালি বাড়ি ফিরলেই মাকে কাছছাড়া করতে চায় না তুতুল। 

'জানেন দিদি, আজকাল আমার আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে করে খুব।দড়ি আমাকে ডাকে।....ভীষণভাবে ডাকে, জানেন? ' কথাগুলো লিটনের মাকে বলছিল শেফালি। লিটনকে প্রাইভেট পড়াই সে।  

---- এ কি বলছো, শেফালি ! 

---- হ্যাঁ, ঠিকই বলছি। আর বাঁচতে ইচ্ছা করে না! তুতুল না থাকলে আমি পৃথিবী ছেড়ে কবে চলে যেতাম! '

তুতুলকে ছাড়া এক মুহূর্ত ভাবতে পারে না শেফালি। ওকে যে করেই হোক, মানুষের মতো মানুষ করে তুলতে হবে।

সেদিন স্কুল থেকে ফিরে সবে বাড়ির চৌকাঠে পা রেখেছে শেফালি, বাইরে থেকে শোনা যাচ্ছে তুতুলের কথা। বাবার সঙ্গে কথা বলছে সে। তুতুলের সঙ্গে একটু খুনসুঁটি করে বাবা মজা পায়, জানে শেফালি । একটা মাইনর অ্যাটাক এরমধ্যেই হয়ে গেছে বাবার। সবই তার চিন্তায় চিন্তায়। বোন রিমিলের সংসারে কোনও অশান্তি নেই। দিব্যি সংসার করছে সে। যত সমস্যা তার বেলা! বাবা আগে ঘুমের ট্যাবলেট খেত না। এখন রোজ খায়। মানে খেতে হয় আরকি। নইলে ঘুমই  আসবে না। মাকে প্রায়ই বলে, 'জানো, মেয়েটার মুখের দিকে তাকাতে পারি না, কান্না পায়। কি ছিল, কি হল মেয়েটার! কতদিন ওর হাসি মুখটা দেখিনি!' বাবা যে খুব চাপে আছে, বোঝে শেফালি। ডাক্তার বলেছেন, 'কোনও চাপ নেবেন না, দত্তবাবু। সবসময় হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করবেন।' শেফালি ভাবে, তুতুল না থাকলে বাবার যে কিভাবে সময় কাটতো ! 

দরজার পর্দা হাওয়ায় দুলছে। শেফালি সরালো না! দাঁড়িয়ে থাকলো পর্দার এপারে। যতদূর বুঝতে পারলো, বাবার নস্যির কৌটোটা জানলা দিয়ে বাইরে ফেলে দিয়েছে তুতুল। আর সেইজন্যেই বাবা ঠাট্টাচ্ছলে মা'কে বলছে ," কই গো, ওটাকে বের করে দাও তো ঘর থেকে। বদমাশটা আবার আজকে আমার নস্যির কোটোটা ফেলে দিয়েছে! '

অমনি তুতুলের উত্তর," আমাকে ঘর থেকে বের করে দিলে মা তো আর বাচ্চা পাবে না ! "

---"দরকার নেই আমাদের। আমরা বাজার থেকে কিনে নিয়ে আসবো।"

ঢোক গিলে গিলে ধীরে ধীরে তুতুল বলতে লাগলো' "বাজার থেকে? ওরা তো পুতুল! কথা বলতে পারবে না। মা'কে চুমুও খেতে পারবে না....।"

তুতুলের অস্ফুট কথাগুলো শুনে চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়তে লাগলো শেফালির। কোনওরকমে চোখটা মুছে পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকতে যাবে, অমনি তুতুল তাকে দেখে দৌড়ে এসে 'মা' 'মা' বলে জড়িয়ে ধরলো।

দড়ি তাকে ডাকলেও, তুতুলের এই ডাকটাকে উপেক্ষা করতে পারে না শেফালি। এই ডাকই তো তার বেঁচে থাকার অক্সিজেন! 

বাঁচার মতো বাঁচতে তো সে চেয়েই ছিল। কিন্তু বিন্নিপিসির কথা শুনে একটা ভুল সিদ্ধান্ত সেদিন নিয়ে ফেলেছিল বাবা। টাকা দিয়ে মেপে ছিলো জামাইকে, শেফালি যেটা চায়নি। তাকে প্রায় জোর করেই এই বিয়েতে রাজি করানো হয়েছিল। 

মাঝে মাঝে শেফালির মনে হয়, এও এক চক্রান্ত। 



------


রবিবার, ২৯ জুন, ২০২৫

সুজয় চক্রবর্তীর গল্প : ভালো লোক, খারাপ লোক



দেবুর সঙ্গে আমার ঝামেলাটা এখন মারাত্মক পর্যায়ে চলে গেছে। 

দেবু আমার কলিগ। কিন্তু ওকে আমি আর এক মুহূর্ত সহ্য করতে পারছি না। সম্ভবত দেবুও আমাকে সহ্য করতে পারছে না। না পারারই কথা।


কেননা আমি 'চাকে ঢিল মেরেছি।' বেশ করেছি। আমার চোখের সামনে দিয়ে একটার পর একটা অন্যায় হয়ে যাবে, আর আমি মুখ বুঁজে সব দেখে যাবো! কক্ষনো না। আমি সেই বান্দাও নয়। নালিশ ঠুকে দিয়েছি একেবারে বিডিও-র কাছে।

বছরখানেক হল আমি এই অফিসে ট্রান্সফার নিয়ে এসেছি। তারজন্য আমাকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। কয়েকজনকে আবার 'মিষ্টিমুখ'ও করাতে হয়েছে। চাকরির প্রথমে পোস্টিং ছিলাম রায়গঞ্জ। ওখানে অন্য কোনও অসুবিধা আমার ছিল না। বরং ভালোই ছিলাম। উপরি পাওনাও ছিল বেশ। শুধু অসুবিধা ছিল বাড়ির থেকে দূরত্ব। দূরত্ব মানে প্রায় সাড়ে তিনশো কিলোমিটার।


ডেলি প্যাসেঞ্জারি তো সম্ভব ছিল না। তাই মাসে একবার বাড়িতে আসার চেষ্টা করতাম। কোনো কোনো মাসে সেটাও হয়ে উঠতো না। ছেলে তখন খুব ছোট। হাঁটাও শেখেনি। খুব কষ্ট হতো মিতালীর। তবু একা হাতে ঐ-ই সব সামলে নিতো। ওর কষ্টটা বুঝতাম। এসব জানতো দত্তদাও। আসলে আমিই বলতাম। রায়গঞ্জের অফিসে দত্তদা ছিল আমার কলিগ কাম প্রিয়জন। লোকাল লোক। খুব ভালোবাসতো আমাকে। আমার লোকাল গার্জেন বলা চলে। একদিন দত্তদা কথায় কথায় বললেন, 'দীপঙ্কর, বাড়ি থেকে দূরে থাকার কষ্টটা আমি বুঝি। একটা সময় আমিও দূরে ছিলাম। তা তুমি ট্রান্সফার নিচ্ছ না কেন?'

------ দাদা, যদি বাড়ির কাছে যেতে পারি তবে নিশ্চয় নেবো।

------ তারজন্য তুমি একবার হেড অফিসে যোগাযোগ করতে পারো! 

------- আপনার চেনাজানা কেউ আছে? 

------- আগে তো ছিল না। তবে এখন আছে।

তারপর দত্তদার কথামতো ওঁরই দূর সম্পর্কের আত্মীয় মুখার্জি সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। অমায়িক লোক। উনিই আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন বড়ো সাহেবের ঘরে। এরপর অনেক অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে, অবশেষে বাড়ির কাছে ট্রান্সফার নিয়ে এলাম। তাও পাক্কা ছ'বছর পরে। 

বাড়ি থেকে এখন আমার অফিস যেতে বাইকে মাত্র পাঁচ মিনিট লাগে। এটুকু পথ হেঁটেও চলে আসা যায়। তবু সেকশন-অফিসার বলে কথা। তাছাড়া বাড়িতে বাইকটা পড়ে পড়ে নষ্টও হচ্ছিল। তাই ওটাকে কাজে লাগালাম। 

অফিসে সবার সঙ্গেই আমার সদ্ভাব আছে। তবে দেবুর সঙ্গেই যেন আমার একটু বেশি সখ্য তৈরি হয়ে গেল! এ নিয়ে অনেকের চোখ টাঁটাতো। জানতাম। দেবুও জানতো। একদিন তো অফিসের পুরনো স্টাফ সঞ্জীব শূর কথায় কথায় বলেই ফেললেন, 'বাঃ, নতুন স্যারের সঙ্গে তো দেখছি দেবু স্যারের বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেছে!' আমি তখন শুধু মুচকি হেসে চুপ থেকেছি। কেননা আমি বিশ্বাস করি, কলিগ কখনো বন্ধু হতে পারে না। তবে অবশ্য দুই সম্পর্কে 'বন্ধুতা' খুঁজে পাওয়া যায়। যেমন রায়গঞ্জে ছিলেন দত্তদা। আমার লোকাল গার্জেন। তবে এখানে আমার লোকাল গার্জেনের ব্যাপার-স্যাপার নেই। কেননা আমার জন্মই এই শহরে। আমার লেখাপড়া ------স্কুল-কলেজ, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব, এক কথায় সবই এখানে। 

কিছুদিন আগেও, আমাদের অফিসটাতে আমাকে আর দেবুকে পাশাপাশি বসে কাজ করতে দেখেছে লোকে। তাছাড়া কখনও বা অফিসের কাজে ওর বাইকে আমি, আমার বাইকে ও, একসঙ্গে গিয়েছি। কিন্তু সেসব দৃশ্য এখন অতীত। আমি সেসব কথা ভুলে যেতে চাই। দেবুও সম্ভবত সব ভুলে গিয়েছে। মানুষ চেনা অত সহজ নয়। সবকিছু বুঝে নিতে আমার একটু সময় লেগেছিল। এখানে এসে দেখলাম, দেবুর সায় ছাড়া কোনও ফাইল পাশ হয় না। অফিসের ইতিহাসে নাকি আগেও হয়নি। অন্তত দেবু জয়েন করার পর থেকে এখানে নাকি এই রীতিই চলে আসছে! 

অফিসে দেবু আমার সিনিয়র হলেও বয়স কিংবা কাজের অভিজ্ঞতাতে আমি ওর সিনিয়র। তবে ওর প্লাস পয়েন্ট এই, শুরু থেকেই ও পোস্টিং এখানে। এক ডাকে সবাই চেনে ওকে। বিডিও, এসডিও, এমএলএ, এমনকি রুলিং পার্টির ছোট-বড় নেতার সঙ্গেও ওর দহরম-মহরম সম্পর্ক। প্রত্যেকের কন্টাক্ট নাম্বার ওর মোবাইলে সেভ করা। দেবুর সবচেয়ে বড়ো গুণ, কোন দেবতা কোন ফুলে তুষ্ট হয়, সেটা ও ভালো করেই জানে। আর এইজন্যই দেবুকে সবাই খাতির করে চলে। তাই দেবু লোকাল ছেলে নাহলেও এখানে জাঁকিয়ে বসতে ওর কোনও অসুবিধা হয়নি। বহাল তবিয়তে আছে। ছোটমোটো, যেকোনো কাজে পাব্লিক এসে আগে ওর খোঁজ করে। অথচ আমি ও দেবু একই পোস্টে আছি! 

যাইহোক, বাঁ-হাতের ইনকাম যে দেবুর বেশ ভালোই, সেটা ওর বাড়ি দেখলেই বোঝা যায়। কেননা একবার আমাকে দেবু নিয়ে গিয়েছিল ওর বাড়িতে। মার্বেল বসানো তিন তলা বাড়িটাকে আমার তো ছোটখাটো একটা প্রাসাদ মনে হয়েছিল! আর ওর গলার সোনার চেনটার কথা নাইবা বললাম।

আমার আর দেবুর ব্যাপারটা বাড়িতেও ইতিমধ্যে জানাজানি হয়েছে। আসলে আমিই বলেছি মিতালীকে। বাধ্য হয়ে। না বলে উপায়ও ছিল না। আমি মানসিক অশান্তিতে থাকলে, কেমন করে জানি মিতালী সব জেনে যায়! বিয়ের পর থেকে বহুবার হয়েছে এমনটা। লাস্ট যেদিন দেবুর সঙ্গে বেশ বড় রকমের কথা কাটাকাটি হল, আমাকে ও 'দেখে' নেওয়ার হুমকি দিল, সেদিন অফিস থেকে বাড়ি ফিরে সবে সোফায় বসেছি, অমনি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে  মিতালী বললো, 'কী হয়েছে?'

------ কই? 

----- মুখ কালো করে বসে আছো!

------ কই মুখ কালো? 

------ কই মানে! কী হয়েছে, বলো?

------ বলছি তো কিছু না।

------ কিছু না? তুমি হা করলেই আমি হাওড়া বুঝে যায়। বলো কী হয়েছে? 

ওর কথা শুনে হেসে ফেললাম। বললাম, 'হ্যাঁ, তুমি তো সবজান্তা।'

------ হ্যাঁ, আমি সবজান্তা। বলো।

নাছোড় মিতালীকে অবশেষে সব খুলে বললাম। ও দেবুকে চেনে। বারকয়েক আমাদের বাড়িতে এসেছে ও। 

সব শুনে মিতালী বললো, 'বাঃ, তুমি সম্পর্ক তৈরি করতে যেমন ওস্তাদ, দেখছি ভাঙতেও তেমন ওস্তাদ। এই কিছুদিন আগে তোমার মুখ থেকেই শুনেছি, দেবুর মতো নাকি ছেলেই হয় না! ও খুব ভালো লোক। আর আজ তুমিই কি-না বলছো, ওর মতো খারাপ লোক পৃথিবীতেই নেই!'

------ হ্যাঁ বলছি। ঠিকই বলছি, মিতালী। ওর মতো হারামি আমি আর একটাও দেখিনি। চায়লে ও মানুষ পর্যন্ত খুন করতে পারে, জানো! 

------ না, আমার জানার দরকার নেই। তুমিই জানো। জলে থেকে কুমিরের সঙ্গে কেউ লড়াই করে না। ও কি তোমাকে ছেড়ে দেবে ভেবেছো? তুমিই তো বলেছিলে, ওর শ্বশুরের নাকি মন্ত্রী লেবেলে জানাশোনা। আবার রুলিং পার্টির মেম্বার। এবার ঠ্যালা সামলাও। ট্রান্সফার এই হলে বলে।

------ যা হবার, তাই হবে। অতশত ভাবি না।

------- না, তুমি ভাববে কেন? ভাববো তো আমি! বুবাইকে সবেমাত্র নতুন একটা স্কুলে ভর্তি করানো হল। আর এখন ট্রান্সফার হলে ওর পড়াশোনাটা তো লাটে উঠবে! 

------ তা কেন! যদি ট্রান্সফার হই, তোমাদের কোত্থাও যেতে হবে না। বুবাই এই স্কুলেই পড়বে। তোমরা এখানেই থাকবে। 

------- ও, আবার তুমি সেই মেস করে থাকবে! বাড়ি থেকে খেয়ে অফিস যাচ্ছ, দরকার পড়লে বাড়ি চলে আসতে পারছো, এসব ভালো লাগছে না, না? ভূতে কিলোচ্চছে?

------- বাড়ির কাছে থাকবো বলে কি আমাকে সবকিছু মাথা পেতে সহ্য করে নিতে হবে? 

------- হবে। তোমার মতো ঐ অফিসে আরও অনেকে আছে। তারা যদি মানিয়ে নিতে পারে, তবে তোমার অসুবিধাটা কোথায়? তুমি কোন হরিদাস পাল? তুমি এখানে ট্রান্সফার নিয়ে এসেছো বছরখানেকও হয়নি। আবার এরমধ্যেই যদি ট্রান্সফার হও, লোকে কি বলবে? 

------ লোকে কি বলবে, তা নিয়ে আমার ভেবে কাজ নেই। ওটা লোকেই ভাবুক।

------ ও, তাই না-কি! তবে বাড়ির কাছে এলে কি জন্যে? পরিবারের সঙ্গে যদি না থাকতে চাও, তাহলে তো তোমার রায়গঞ্জে থাকাই ভালো ছিল। 

আমি চুপ মেরে গেলাম। আর কথা বাড়ায়নি। 


।।২।।

মিতালী যা আশঙ্কা করেছিল, ঠিক তাই। আজ অফিসে টিফিন আওয়ারে বসে ছিলাম আমার টেবিলে। পাশের ঘরের দিলীপবাবু এসে বললেন, 'দীপঙ্কর, তোমাকে মনে হয় ফোর্স ট্রান্সফার করছে উপর মহল থেকে, শুনেছো?'

------ না তো! আপনি জানলেন কী করে? 

------ আমি কানাঘুষো শুনছিলাম। বিডিও অফিস গিয়েছিলাম। ওখান থেকেই খবরটা পেলাম।

------ মেইল-টেইল এসেছে নাকি? 

------ এসেছে মনে হয়।

------- আচ্ছা। তবে আমাকে এখনও অফিসিয়ালি কিছু বলা হয়নি।

দিলীপদা শুধু বললেন, 'ওর সঙ্গে এতটা ঝামেলায় না জড়িয়ে গেলেই মনে হয় ভালো হতো।'

'ওর' বলতে যে দেবুর কথা বলছেন, তা আর বুঝতে বাকি থাকলো না। আমি কথা বাড়ালাম না। একটা শুষ্ক হাসি দিয়ে আলুপোস্ত দিয়ে রুটি চিবোতে লাগলাম।

বাড়িতে এসে বউকে বললাম, 'একটু কড়া করে চা করো তো, মিতালী। পারলে একটু আদা দিও।' আমার কথা শেষ হতেই মিতালী দেখলাম রান্নাঘরে চলে গেল। কেননা সেদিনের পর থেকে মিতালী যতটুকু প্রয়োজন,  তার বেশি আর কথা বলছিল না। 

আমি একটা তোয়ালে টেনে বাথরুমে ঢুকে গেলাম। হাতমুখ ধুয়ে এসে আলমারি থেকে সব ফাইলপত্র নিয়ে বসলাম। কাগজপত্র সব ঠিকঠাক আছে কি-না একবার দেখে নিতে হবে। নইলে নতুন জায়গায় বেশ সমস্যায় পড়তে হতে পারে। এই অফিসেই তো হয়েছিল অ্যাপ্রুভালের সময়। কি একটা কাগজ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। সম্ভবত এল.পি.সি। তাই সব কাগজ গুছিয়ে রাখতে হবে। তার আগে একটু চায়ে চুমুক দিতে পারলে শান্তি! 

বুবাই সোফায় বসেছিল। সারাদিনে সে কী কী করেছে জানতে চেয়ে, ওকে কোলে তুলে নিয়ে একটু আদর করছিলাম। এরমধ্যেই মিতালী চা-এর ট্রে নিয়ে হাজির। ট্রে থেকে কাপটা তুলে নিয়ে চায়ে একটা চুমুক দিয়ে বললাম, 'বাঃ!, চা'টা বেশ ভালো করেছো তো।' 

মিতালী মুচকি হাসলো। বুবাইয়ের জন্য একটা ক্যাডবেরির প্যাকেট এনেছিলাম। ওটা নিয়ে ও পাশের ঘরে চলে গেলো। ছেলে চলে যেতেই মিতালীকে আমার ট্রান্সফারের বিষয়টা জানালাম। শুনেই তো প্রায় আঁতকে উঠল ও। তারপর মুখ ঝামটা দিয়ে বললো, ' হলো তো, এবার বোঝ! সব তাতে তোমার বেশি বেশি।' আর কিচ্ছু বললো না। চুপ করে গেলো। 

আমিও কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে দাঁত বার করে হাসতে হাসতে বললাম, 'আমি চাচ্ছিলাম, বুঝলে? আমিই চাচ্ছিলাম, উপর মহলে কলকাঠি নেড়ে অন্তত দেবু আমার ট্রান্সফারটা করে দিক। জানতাম, দেবুর সেই এলেম আছে। সেজন্যই ওকে আমি আর ইদানিং 'সহ্য' করতে পারছিলাম না। কেন জানো? বাড়ির কাছে এসে সত্যিই আমার এক্সট্রা কোনও ইনকাম হচ্ছিল না, মিতালী। যেটা রায়গঞ্জে ছিল। এবার দেখো, প্রতি বছর তোমার আবার একটা করে গয়না হবে। সত্যিই বলছি, দেবু খুব ভালো লোক।'




--------------------


সুজয় চক্রবর্তীর গল্প : বছর দশ পর


ঝিনুককে দরজা বন্ধ করতে দেখেই বুকের ভেতরটা ছ্যাক করে উঠলো শুভেন্দুবাবুর। রাগের মাথায় মানুষ কখন যে কি ক'রে বসে!
----- বড়ো বউমা, দরজা খোলো। দরজা খোলো, মা। এমন ছেলেমানুষি ক'রো না। 
সজোরে দরজা ধাক্কাতে লাগলেন শুভেন্দুবাবু। দাদুকে ওভাবে দরজা ধাক্কাতে দেখে ভয়ে বড়ো বড়ো চোখ করে তাকিয়ে আছে তপাই। শুভেন্দুর তিন বছরের নাতি। স্পষ্ট করে কথা বলতে পারে না এখনও। 
----- মা দলজা খুলতে না কেন দাদান্ ?
----- তুমি একবার ডাকো দাদুভাই, মা ঠিক দরজা খুলবে।
ছোট্ট দুটো হাত দিয়ে দরজায় ধাক্কা দিতে লাগলো তপাই। 
----- মা, দলজা খোলো। মা, দলজা খোলো। 
মা দরজা খুলছে না দেখে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো সে। 
দু'হাত দূরেই সোফায় বসে আছে কমল। না শোনার ভান করে মোবাইলে গেম খেলে চলেছে। নাতিকে কোলে তোলার বৃথা চেষ্টা করে যাচ্ছেন শুভেন্দু। তার কান্না থামছে না কিছুতেই। 
দরজা ভেজানোই ছিল। মুদির বাজার করে ঘরে ঢুকলো সবিতা। কাজের মেয়ে। তপাইকে ওভাবে কাঁদতে দেখে একপ্রকার জোর করেই কোলে তুলে নিল তাকে। কিন্তু থামলো তো না-ই, তপাইয়ের কান্না দ্বিগুণ গেল বেড়ে। 
ওদিকে ঘর বন্ধ করে ঝিনুক সমানে বালিশে মুখ গুঁজে শুধু কেঁদে চলেছে। শেষে কি না গায়ে হাত দিলো কমল! কি হবে এই তাচ্ছিল্যের জীবনটা রেখে! জীবনটা শেষ করে দিতে হাতের কাছে সবকিছুই মজুত। বদ্ধ ঘরে কেউ বাধাও দেবে না! কিন্তু দরজার বাইরে শুধু তার জন্যই এক নাগারে কেঁদে চলেছে তপাই ----- তারই রক্ত, মাংস, দিয়ে গড়া এক অবোধ শিশু। সে চলে গেলে তপাইকে কোলেপিঠে করে কে  মানুষ করবে ? নাড়ি ছিন্ন করে তাকে যে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছিল সে-ই। দায় তো তাই তারই! কেননা এক অকালকুষ্মাণ্ড যদি হয় তার জন্মদাতা পিতা, তার তো প্রতি পদে পদে বিপদ! হঠাৎ ডেসিন টেবিলের আয়নায় চোখ পড়লো ঝিনুকের। আয়নার ঝিনুক যেন তাকে বলছে, ' দরজা খোলো ঝিনুক। তপাই কাঁদছে।'
দরজা খুললো ঝিনুক। তপাইকে সবিতার কোল থেকে নিজের কোলে নিয়ে নি:শব্দে কেঁদে ফেললো সে। শুভেন্দুবাবু তার পিঠে হাত রাখলেন। 
বসার ঘরে সোফার উপরে মাথা নিচু করে তখনও বসে আছে কমল। হাতে মোবাইল। ঝিনুককে বেরোতে দেখে একবার তাকালোও। শুভেন্দুবাবু কমলের দিকে তাকিয়ে বিরক্তির সঙ্গে বললেন, ' ছি!  বড়ো খোকা, ছি! তোকে যে কি বলবো, ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না!'
ঘাড় নাড়তে নাড়তে তিনি নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন। মাথা তুলে বাবার চলে যাওয়ার দিকে তাকালো কমল। তারপর বাইকের চাবিটা নিয়ে সোজা বাইরে বেরিয়ে গেল সে।
এই গম্ভীর পরিবেশে সবিতা রান্না ঘরে যাওয়ার সাহসও পাচ্ছে না। এদিকে বেলা বয়ে যাচ্ছে।
ঝিনুক এখন চোখের জল মুছে তপাইকে স্নান করানোর তোরজোড় করছে। মুখে কোনও কথা নেই তার। আজ দিনটা অন্যরকম। দিন পনেরো আগেই সেটা হতে পারতো। ঝিনুক তা চায়নি। সময়। সময় দিয়েছিল কমলকে। যাতে আর কোনও দিনই সে বর্ণালীর ছায়া না মাড়ায়। গত রাতেও তো এই নিয়ে একচোট হয়ে গিয়েছে। আর আজ সকালে বর্ণালীর ফোনটা আসার পরেই এই গণ্ডগোল।
(২)
----- কে এই বর্ণালী, রজতদা?
সম্পর্ক উর্বর হলে পরও কখন আপন হয়ে যায়। রজতকে দাদা বলেই ডাকে ঝিনুক। রজত কমলের কলিগ। নিজের বোনের মতো ভালোবাসে ঝিনুককে। 
----- বর্ণালী আমাদের সেকশনে নতুন জয়েন করেছে। মেয়েটি এমনি মিশুকে। আনম্যারেড। বাবার একটাই মেয়ে। বাড়ির অবস্থা ভালো।
----- কিন্তু কিভাবে ব্যাপারটা....
----- ওরা প্রায়ই অফিস শেষে একসঙ্গে ঘুরতে বেরোয়, এরকম কানাঘুষো শুনেছি। তবে সেদিন যেটা ঘটেছে...  আর বসে থাকতে পারলাম না, তাই ছুটে এলাম। 
----- কি এমন ঘটলো রজতদা...
----- আমাদের স্টাফ পুলককে তো তুমি চেনো?
---- হ্যাঁ, একবার দেখেওছি রাতুল চৌধুরীর মেয়ের বিয়েতে।
-----  সেদিন প্রায় সবাই-ই ছুটির পর অফিস থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলাম। ছিল শুধু কমল, বর্ণালী, গ্রুপ ডি স্টাফ দুজন আর পুলক। পুলকের মুখের কথায় আমি বিশ্বাস করিনি। যখন মোবাইলে সেই ছবি দেখালো, আমি আকাশ থেকে পড়লাম! কমল কি না  বর্ণালীর কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে, আর বর্ণালী বিলি কাটছে মাথায়!....  জানি তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে শুনতে। কিন্তু মনে হল তোমাকে ঘটনাটা জানানো দরকার। এখনও সময় আছে, কমলকে ও পথ থেকে সরাও। 
রাতে খাওয়াদাওয়া হয়ে গেলে যে দুয়েকটা কথা হয়েছিল ঝিনুক আর কমলের মধ্যে, তা এইরকম : 
---- বর্ণালী কে?
---- রজত এসেছিলো?
---- আমার প্রশ্নের উত্তর পাইনি।
---- ঐ তো বললাম। রজত এসেছিলো নিশ্চয়! ঐ-ই তো সব বলে গেছে। আবার আমাকে জিজ্ঞাসা কেন, বর্ণালী কে?
---- ওর সঙ্গে তোমার কী সম্পর্ক?
---- আর পাঁচটা কলিগের সঙ্গে যেমন...
---- বাজে কথা রাখো। আমি কি বলতে চাইছি, আশাকরি বুঝতে পারছো?
---- কী বলতে চাইছো?
---- স্বাদ বদল করছো?
---- আমার ঘুম পাচ্ছে। এই রাত দুপুরে চেল্লামেল্লি করতে ভালো লাগছে না। 
---- তাই! আচ্ছা, আমাদের কি প্রেম করে বিয়ে হয়েছিলো? 
---- আঃ, একটু ঘুমোতে দেবে?
---- ঘুম? আমার ঘুম কেড়ে নিয়ে তুমি ঘুমোবে?
---- চিল্লিও না। পাশের ঘরে বাবা আছে। তপাই জেগে উঠবে।
---- বাঃ, কতো ভাবো তুমি! কতো ভাবো! এই ভাবনাটাই আগে হয়নি কেন? আমার কথা ভেবেছিলে? ভাবোনি।....  যাক, একটা কথা বলে রাখলাম, দ্বিতীয়বার যেন বর্ণালীকে নিয়ে তোমার নামে কোনও কথা না শুনি। 
(৩)
সেই রাতের পর থেকে বর্ণালীর কোনও নামগন্ধ শোনা যায়নি কমলদের বাড়িতে। অনেকদিন। কিন্তু আজ সকালে একটা আননোন নম্বর থেকে ফোন এসেছিলো কমলের মোবাইলে। কমল তখন টয়লেটে।
---- হ্যালো কে? 
---- আমি বর্ণালী বলছি। কমলদা নেই?
---- বর্ণালী?  না, এটা রঙ নম্বর। ফোনটা কেটে দিয়েছিলো ঝিনুক। এর ঠিক পাঁচ মিনিট পরে আবার ফোন এসেছিলো। সেম নম্বর। ফোনটা ধরে চুপ করেছিলো ঝিনুক। 
---- হ্যালো, ফোনটা কাটছেন কেন, এটা কমলদারই নম্বর।
---- হ্যাঁ, কমলদার নম্বর। কি দরকার বলো।
---- সেটা কমলদাকেই বলবো।
মাথাটা হঠাৎ গরম হয়ে গিয়েছিল  ঝিনুকের। আর সামলাতে পারেনি।
---- বেহায়া কোথাকার! আর কোনও দিনও যদি তুমি এই নম্বরে ফোন করেছো...ফোনটা কেটে দেয় ঝিনুক।
এরমধ্যেই কখন যে কমল তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে, তা টের পায়নি সে। ঝিনুকের হাত থেকে মোবাইলটা এক প্রকার ছিনিয়ে নিয়ে একটা চড় কষিয়ে দিলো কমল। এই প্রথম। দশ বছরের বিবাহিত জীবনে এই প্রথম ঝিনুকের গায়ে হাত তুললো কমল। 
(৪)
তপাইকে স্নান করানো হয়ে গেছে। ও এখন ব্যালকনিতে দাদুর সঙ্গে গল্প জুড়েছে। সবিতা রান্নাঘরে। সবকিছু আন্দাজ করে ঝিনুককে আর ঘাটায়নি সে। ঝিনুক এখন বেডরুমে ঠাইঁ বসে। 
এ ঘটনা কার সঙ্গে শেয়ার করবে ঝিনুক? মা'র সঙ্গে? মা'র বয়স হয়েছে। চিন্তা করবে। তবে কাকে বলা যায়, যাতে একটু হলেও হাল্কা হতে পারে ঝিনুক। কেয়াকে কি ফোন করা যায়! ও তো ঝিনুকের পুতুল-বেলার বন্ধু। ও তো বুঝবে ওর ব্যাপারটা। স্কুলে থাকতে কতো কথা তো শেয়ার করেছে কেয়াকে! 
অনেকদিন ফোনাফোনি হয়নি দুজনের। নম্বরটা ডায়াল করতেই সেই চিকন গলা, বাব্বা, তুই তো একদম ভুলেই গেছিস!
----- ভুললে কি আর ফোন করতাম?
---- যাক্, কেমন আছিস বল্।
---- তুই কেমন আছিস বল্।
ঝিনুকের কথার উত্তরে এক মুহূর্ত না থেমে কেয়া বললো, বিন্দাস! খাচ্ছি দাচ্ছি, ঘুরে বেরাচ্ছি, বরের পকেট কাটছি আর বাচ্চা সামলাচ্ছি।
----বাঃ, খুব ভালো! বরের পকেটও কাটছিস?
---- কি করবো বল, বড্ড হিসাবি। আমি অতোটা পারি না। যাক্, এবার তোর কথা বল্।
একটু হেসেই ফেললো ঝিনুক। সে হাসিতে কি ছিল না বুঝলেও, হাসির শেষে যে দীর্ঘশ্বাস নিল ঝিনুক, তা টের পেল কেয়া।
---- ভালোই তো ছিলাম...কিন্তু ইদানীং কেমন যেন সব এলোমেলো হয়ে গেল!
---- কেন, কি হল? শুনেছি তো শাশুড়ি নেই। ননদও নেই...
---- মিনষে তো আছে।
হেসে ফেললো কেয়া।
---- কি বললি, 'মিনষে'?  তা তোর 'মিনষে' আবার কি করলো?
---- প্রেম।... উনি আবার প্রেমে পড়েছেন।
---- ধ্যাত, কমলদা! এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে।
---- হলেও বলি, এটাই ঠিক। আর তারপর...
---- তারপর কী?
---- না, থাক।
---- আপত্তি থাকলে বলিস না।
---- না, তা ঠিক না। কি আর বলবো বল্, শেষটাই গায়েও হাত তুললো কমল!
---- এমা, তাই!
---- হ্যাঁ। আজ।
বিস্তারিত জানার পর কেয়া সহানুভূতির সুরে বললো, 'আরে, তাতে তুই এত আপসেট হয়ে পড়ছিস কেন বলতো! একটা 'টি-টোয়েন্টি' তুইও খেল না!'
---- মানে?
---- মানে আবার কি, এখন দিনকাল অনেক বদলে গেছে। সব জেনেশুনেও কাছুমাছু হয়ে ঘরের কোনায় বসে থেকে আসন সেলাইয়ের দিন নেই আর। ওকেও বুঝতে দে না কতটা কষ্ট তুই পেয়েছিস। একা একা কেন গুমড়ে মরবি! তোরও তো একটা জীবন আছে। পছন্দ-অপছন্দ, ভালোলাগা -মন্দলাগা আছে!
---- কী বলতে চাইছিস ?
---- বলছি, একটা বন্ধু খোঁজ ঝিনুক। দেখবি, তোর পরিচিত গণ্ডির মধ্যেই কাউকে পেয়ে যাবি; যে তোর অনুভূতিগুলো বুঝতে পারবে।
---- ইয়ার্কি মারিস না কেয়া।
---- আমি ইয়ার্কি মারছি না রে। সত্যি বলছি, এখন একজন বন্ধুর খুব দরকার তোর। যে তোর কথা ভাবে না, তুই-ই বা তার কথা ভেবে ভেবে কষ্ট পাবি কেন! তাছাড়া তুই উচ্চ শিক্ষিত, একটা কাজ ঠিক জোগাড় করে নিতে পারবি, দেখবি।.... তবে তপাই ছেলে মানুষ। ওকে কষ্টটা বুঝতে দিস না।'
---- এসব কোনও দিন স্বপ্নেও ভাবিনি কেয়া। এসব স্কুল-কলেজ লাইফে হলে বলতে পারতিস। এখন আমরা সংসারী। এসব ভাবাও তো পাপ!
---- পাপ? সংসার কি তোর একার না কি? সে তো এসব কিছু ভাবছে না!.... শোন, তুই ভালো থাকলে বন্ধু হিসেবে আমারও ভালো লাগবে। তাই বলা.... এই রে! 
---- কি হল?
---- আর বলিস না,  আমার ছোটছেলেটাতো এখন একা একাই পায়খানায় বসতে শিখে গেছে। কিন্তু পটি করার পর জলটা সেই আমাকেই ঢেলে দিতে হয়। পটি করে দাঁড়িয়ে আছে। ডাকছে। ভালো থাকিস, বুঝলি। পরে ফোন করবো। 
মোবাইলটা খাটের ওপর রেখে চুপ করে বসে থাকলো ঝিনুক। অনেকক্ষণ। ভাবছিল কেয়ার কথাগুলো। এটা ঠিক, কমলের সঙ্গে তার সম্পর্কটা আর আগের মতো নেই। জানে কমলও। এভাবে সম্পর্ক টেকে না। সত্যিই তো, সংসার তার একার নয়, কমলেরও। কি হবে এই মিথ্যে সম্পর্কটা আগলে রেখে! লোক দেখানো 'বরবউ' সেজে! 
ঝিনুক ভাবছিল তপাইয়ের কথাও। যদি সত্যিই একদিন তপাইকে সঙ্গে করে বেরিয়ে যেতে হয় এই সংসার থেকে, কিভাবে নেবে ও ব্যাপারটাকে? প্রথম প্রথম খুব কষ্ট পাবে নিশ্চয়। তারপর ধীরে ধীরে সব সয়ে যাবে। 
---- বউমা, দাদুভাইকে খাইয়ে দাও। ওর পেটে কিছু নেই। 
পেছন ঘুরে ঝিনুক দেখলো বাবা দাঁড়িয়ে। শুধু তো তপাই নয়, এই লোকটির কথাও তো তার ভাবা দরকার। বয়স হয়েছে তারঁ। হার্টের পেশেন্ট। তপাইকে তারঁ কোল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেলে,  তিনি কি করে বাঁচবেন? তিনি তো একা! 
---- ও, বউমা, আজ কমল এলে আমি একবার তোমাদের সঙ্গে বসবো, বুঝলে! 
ঝিনুককে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই শুভেন্দুবাবু ধীরে ধীরে তারঁ শোওয়ার ঘরের দিকে পা বাড়ালেন।
শ্বশুর মশাইয়ের চলে যাওয়ার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ঝিনুক। ঋজুদেহ মানুষটাকে আজ কেমন ঝুঁকে চলতে দেখলো সে!
   
--------

বুধবার, ২৮ মে, ২০২৫

একটি প্রেমের গল্প : সুজয় চক্রবর্তী



ব্যাচেলার থাকার এই এক সমস্যা।  সহজে বাড়ি ভাড়া পাওয়া যায় না । সবাই-ই 'ফ্যামিলি' চায়!

আমার এখনও 'ফ্যামিলি' হয়নি । লাইনে আছি । কিন্তু সেই সময়টুকু দিলে তো ! যেখানেই ঘরের জন্য যাই, সেই এক কথা, 'ফ্যামিলি আছে তো? ', 'ও, আপনি ব্যাচেলর ! না  ভাই, অন্য কোথাও দেখুন।' একজন তো একবার বলেই দিলেন, ' ঘর তো ফাঁকা। বলেন তো, হাতে একটা মেয়ে আছে, দেখাতে পারি।' মানে আমাকে বিয়ে দিয়ে তবেই তিনি তার ঘরে ঢোকাবেন ! বিটকেলে পাবলিক সব । কিছুতেই বোঝাতে পারি না, আমার এখন বউ চাই না, ঘর চাই। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে সবে মাত্র চাকরিটা পেয়েছি । বাড়ি থেকে বেশ দূরে। একটু গুছিয়েগাছিয়ে না নিয়ে এসবে নেই আমি ! সেকথা বাড়িতেও বলেছি । দুটো বছর সময় লাগবে আমার। কিন্তু বাড়ির লোকও সে কথা শুনলে তো!  বিশেষ করে মা। সারাক্ষণ কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান। কোনওরকমে থামিয়ে রেখেছি। আর ঠিক করেছি, বছর দুই পরেও যদি বাসা ভাড়াই থাকি, তো ঐ লোকটাকে গিয়ে একদিন বলবো, ' এই দেখুন, ফ্যামিলি আছে । ঘর খালি আছে আপনার? '

যাইহোক, শেষে আমার মেজো মাসির দূর সম্পর্কের এক জামাইকে ধরেটরে অনেক খোঁজ-খবর করার পর জয়িতাদের এই বাড়িটাতে থিতু হয়েছি ।

আমি এ পাড়ায় নতুন । এক মাসও হয়নি। ধীরে ধীরে পরিচিত হচ্ছি আশপাশের লোকজনের সঙ্গে । অনেকের সঙ্গেই আলাপ এখনও বাকি । সামান্য যাদের সঙ্গে কথা হয়েছে, তাদের মধ্যে আছে সনাতনের বাবা, কীর্তনীয়া বিশু, সুমনের দিদিমা আর বিশালের মা ।
 অফিস যাওয়ার সময় একটা দৃশ্য আমি রোজ দেখি । জয়িতাদের বাড়ির পাশের ফাঁকা মাঠটাতে একটা বাচ্চা মেয়ে খেলছে। একা একাই । বয়স তিন কি চার হবে । কখনও কাদামাটি, কখনও ধুলোবালি নিয়ে ওর খেলা । কোনও ঝামেলা নেই। কান্নাকাটি নেই।

 একদিন অফিস যাওয়ার পথে ওর নামটাও জানতে পেরেছি । পামেলা। খুব মিষ্টি একটা মেয়ে। খালি গা। সারা হাতপায়ে ধুলো। কিন্তু একগাল হাসি।
আমার নতুন চাকরি। বাড়ি থেকে  হাতে একটু সময় নিয়ে বেরোই । অনেকদিন অফিস থেকে ফেরার সময়েও ঐ একই ছবি দেখেছি । বাচ্চাটা একমনে খেলছে । কখনও পুতুলকে শাড়ি পরাচ্ছে, কখনও হাড়িতে ভাত চাপিয়েছে ; এইরকম আর কি।

এরমধ্যেই পামেলা আমাকে বেশ চিনে ফেলেছে ৷ রাস্তায় দেখলেই জিজ্ঞাসা করে, ' কাকু, কুথায় যাচ্ছো? কখনও বাজারফেরত আমাকে দেখতে পেলে জানতে চায়, 'কী এনেছো ?' আবার কখনওসখনও আমিও ওর 'রান্না' করা খাবার মুখে দিয়ে বলি, 'বাঃ, হেব্বি হয়েছে !' ও খুব মজা পায়। কিন্তু প্রায়ই ও 'ডিমে'র ঝোল 'রান্না' করে। আর সেই গরম ডিমের ঝোল খেয়ে আমার যখন জিভে 'ছ্যাঁকা' লাগে, তখন যেন ওর হাসি আর ধরে না মুখে! মাঝেসাঝে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি  পামেলার মা'কে । কখনওসখনও চোখাচোখি হয়। ঐ পর্যন্তই।  কথা হয়নি কোনও দিনও। তবে আমি যে জয়িতাদের ভাড়াটে, সেটা জানে।

আজ যাওয়ার সময় দেখলাম পামেলা কাঁদছে! রান্নাবাটি খেলছিল। বোঝা গেল ওকে কেউ বকেছে । খুব খারাপ লাগলো । থেমে গেলাম ।
মুখ নামিয়ে বললাম , ‘ কি হয়েছে তোর, কাঁদছিস কেন ?’
---- মা মেরেছে।
---- নিশ্চয় তুই দুষ্টুমি করেছিস?
---- না, আমি কিছু করিনি...
---- তাহলে মা তোকে এমনি এমনি মারলো !
----- হ্যাঁ ।
---- আচ্ছা, দাঁড়া, তোর মা'কে আমি বকে দিচ্ছি।
কথাটা বলে নিচু হয়ে ওর চোখদুটো হাতের চেটো দিয়ে মুছে দিলাম।

খেয়াল করিনি । চোখ সরাতেই দেখলাম সামান্য তফাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে পামেলার মা ! শিউলি।  সেদিন জেনেছি ওর নামটা।  জয়িতা কোন একটা ব্যাপারে 'শিউলি বৌদি' বলে কথা বলছিল।

তা, 'বৌদি' যখন, দাদা নিশ্চয় আছে। এর আগে এত কাছ থেকে ওকে কখনও দেখিনি। যেটুকু নজরে পড়লো, তাতে হাতে চুড়ি, মাথায় সিঁদুর কিছুই দেখলাম না। অবাক হইনি। এখন অনেকেই এসব পরে না। এরজন্য যুক্তিও আছে তাদের। আমার মাসতুতো বোনটা  এরকমই। ও প্রায়ই একটা কথা বলে,' কই, পুরুষরা তো বিয়ের পর কোনও চিহ্নই বয়ে বেরায় না, যার থেকে বোঝা যায় পুরুষটি বিবাহিত! তাহলে মেয়েরা কেন বয়ে বেড়াবে!' তাতো ঠিকই । একেবারেই বাস্তব । আমার ভালো লাগে ওর কথা। আমি সায় দিই।

শিউলির দিকে তাকাতে দেখলাম লজ্জামাখা একটা মুখ ৷ কিন্তু বেশ মোহময়ী। নিশ্চিত, পামেলার সঙ্গে আমার কথাবার্তা ও শুনেছে! ততক্ষণে আমিও কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গিয়েছি । বকা তো দূর অস্ত। শিউলিকে দেখে মুখ দিয়ে কোনও কথাই আমার বেরোলো না!  আর বেরোবেই বা কি করে? তাকে বকার অধিকারই বা আমাকে কে দিয়েছে ? মাথা নিচু করেই ছিলাম। ঘড়িতে চোখটা পড়তেই পা চালালাম। শুধু আমার চাকরিটাই নতুন নয়, অফিসে বসও নতুন!
এরপর শিউলিকে দূর থেকে দেখলেই আমি মাথা নিচু করে ফেলতাম। লজ্জায়। লজ্জা পাবারই কথা। যার সঙ্গে তেমন কোনও পরিচয় নেই, সেই তাকেই কি না বকাঝকা! বুঝতে পারলাম সেদিন কথাটা বলে ঠিক করিনি। কথাটা যে জাস্ট বলার জন্যই বলা, তা শিউলিও জানে। তবু লজ্জাটা আমার একটু বেশিই। তাই মাথা হেঁট হয়ে যেত ওকে দেখলে। শেষ পর্যন্ত অফিস যাওয়া আসার রাস্তাটাই পালটে ফেললাম! এখন পামেলা বা শিউলি কারও সঙ্গেই আর দেখাটেখা হয় না।

পাড়ায় যাদের সঙ্গে দেখা হলে খুব সহজেই পাশ কাটাতে পারি না, তাদের মধ্যের একজন হল কীর্তনীয়া বিশু। ওর কথা বলার ধরন যে কাউকেই মুগ্ধ করে। রাস্তায় দেখা হলে কুশল সংবাদ ও  জিজ্ঞেস করবেই,  এই সৌজন্যবোধটা ওর আছে । কীর্তনীয়া বিশু এ পাড়ায় অনেক দিন আছে । দূর সম্পর্কের এক মামার বাড়িতে থাকে, খায়। এছাড়া নিজের আর কেউ নেই। রোজগার বলতে অন্য তল্লাটে গিয়ে  কীর্তন শুনিয়ে যা পায়। খুচরো পয়সা, চাল-ডাল। বিয়ে-থা হয়নি। আর জীবনে করবে বলেও মনে হয় না৷  পাড়ার প্রায় সব খবরই রাখে ও। দীপকের বউয়ের কবে বাচ্চা হবে, নন্দিতার বৌদি কেন বাপের বাড়ি চলে গেছে, টুম্পার বাবা কেন ওর দাদাকে মেরেছে, এমন হাজারটা ঘটনার কথা জানে ও ।

আজ শনিবার। অফিস ছুটি। খোকনের পান বিড়ির গুমটির সামনে বিশুকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। সকাল থেকে বৃষ্টি হচ্ছিল । তাই হয়তো আজ আর বেরোয়নি । কথায় কথায় পামেলাদের কথা উঠলো। মানে, আমিই উঠালাম আর কি। জানতে পারলাম বিয়ের বছর খানেকের মাথায় না কি বাইক অ্যাক্সিডেন্ট হল তরিতের। তড়িৎ মানে পামেলার বাবার। পামেলা তখন পেটে। ব্রেন ইনজুরি।  সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা চললো ছ'মাস। প্রথম দিকে কিছুটা ভালোর দিকে ছিল তড়িৎ। শেষে ভুল চিকিৎসায় মারা গেল ! এরজন্য ডাক্তার ,নার্স দায়ী না । দায়ী নাকি শিউলিই ! 'অলক্ষ্মী' আসার পর থেকেই এক এক করে অনেকগুলো অঘটন ঘটেছে তাদের সংসারে। তাই শাশুড়ি মা যে আর কোনও অঘটন ঘটাতে চান না, সে কথা ঠারেঠোরে বুঝিয়েও দিয়েছেন। তবু মুখ বুঁজে ছিল শিউলি। কিন্তু যেদিন পামেলা হল, সেদিন হাসপাতাল থেকেই সে যাতে বাপের বাড়ি চলে যেতে পারে, তার সব বন্দোবস্ত পাকা করে রেখেছিলেন শাশুড়ি মা। সেই থেকে শিউলি আছে বাপের বাড়ি। আসলে গীতা দে'র মতো শাশুড়ি যার কপালে, তার সংসার জীবনে তো অনেক কষ্টই ভোগ করতে হবে! শিউলি ঝরে পড়লো অকালে ; মা-বাবার সংসারে। এখন সে বাধ্য হয়ে বিড়ির কুলো হাতে নিয়ে বসেছে।

শিউলির সম্পর্কে যেটুকু বললো বিশু, তাতে যেকোনও সংবেদনশীল মানুষেরই খারাপ লাগতে বাধ্য। আমারও লেগেছিল। আরও বিশেষ করে খারাপ লাগলো ওর সম্পর্কে কিছু ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে বসে ছিলাম। একজন স্বামীহারা মহিলা কত কষ্ট সহ্য করে যে একটা বাচ্চাকে মানুষ করে তুলছে, তার প্রতি সহানুভূতি দেখানোর যে প্রয়োজন, সে বোধ আমার ছিল না। করুনা হয় নিজের ওপর।

আজ আবার বিশুর সঙ্গে দেখা বটতলায়। একথাসেকথায় বিশু যা বললো, আমি তো শুনে থ'। শিউলি নাকি আমাকে আর দেখা যায় না কেন, তা জিজ্ঞেস করেছে তার 'বিশুদা'কে । বিশুকে সে এও  বলেছে, তাকে না কি অনেক দিন কেউ বকেনি ! শুধু সান্ত্বনা দিয়ে গেছে সবাই। সে এখন চায়, তাকেও কেউ বকুক।

আজ বছর দশ পরেও বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি, শিউলিকে এতটুকু বকিনি আমি!

              -----------------------
(প্রকাশিত)

সোমবার, ২৪ মার্চ, ২০২৫

সুজয় চক্রবর্তীর গল্প : যেজন আছে মাঝখানে



ক্রমাগত হুমকির শিকার হচ্ছিল পলাশ। দাঁতে দাঁত চেপে এতদিন সব সয়ে যাচ্ছিল। এছাড়া তার আর কিছু করারও ছিল না। কিন্তু আজ যখন গায়ে হাত দিলো আব্দুলরা, ঘুষি দিয়ে মুখ ফাটিয়ে দিলো, তখনই সে স্থির করে নিয়েছিল আর পড়ে পড়ে মার খাওয়া যাবে না। পালাবে। তবে একা নয়, দুজনে।  

কলেজের ফাইনাল পরীক্ষা শেষ। বিকেলবেলা। আব্দুলদের পাঁচজনের দলটা ওকে যখন মারতে মারতে কলেজের মাঠের মাঝখানে নিয়ে গেল, তখন পলাশের গলার টুঁটি চেপে ধরে আব্দুল বলছিল, 'কাল থেকে তোকে যেন এলাকায় না দেখি। তাহলে কিন্তু ফল ভালো হবে না বলে দিচ্ছি।' পলাশ কিছু বলতে পারেনি। বলার চান্সই পায়নি। 

সারা কলেজ তখন হইহই রইরই অবস্থা। এলাকার প্রায় সব লোক ছুটে এসেছে সেখানে। কিন্তু কেউ আব্দুলদের হাত থেকে পলাশকে বাঁচানোর কোনো উদ্যোগই নিল না!  আসলে আব্দুলদের চেনে না, এলাকার খুব কম মানুষই আছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মার খেল পলাশ। ওর হয়ে কেউ বলবার ছিলো না তা নয়, বলেওছিল একজন, সে জাফর, 'ওই তোরা ওকে ছাড়। এই পলাশ শোন, মামনিকে যদি ভালোবাসিস, মামনিকে যদি বিয়ে করতে চাস, তাহলে মুসলমান হয়ে যা। কোনো বাঁধা থাকবে না। তখন তোর গায়ে হাত দেয় কোন কুত্তার বাচ্চা!' হাতের চেটো দিয়ে তখনও রক্ত মুছছে পলাশ। কোনো কথা বলেনি।

গণ্ডগোলের শুরু স্কুল থেকেই। কলেজে এসে সেই আগুনে ঘি পড়ছে শুধু। কো-এড স্কুলে ছেলেমেয়েদের মধ্যে একটু-আধটু প্রেম-টেম হয়। চিরকাল তা হয়েই আসছে। সব জায়গায়। তাই বলে একেবারে চিপকে যাওয়া কেস, এর আগে নিরঞ্জন ঘোষ স্মৃতি বিদ্যাপিঠে হয়নি, যেটা মামনি আর পলাশের মধ্যে হয়েছিল! কাঁঠালের আঠা নয় যে তেল দিলে উঠে যাবে। এ যেন ফেভিকুইক! পলাশরা দত্ত। কায়স্থ। মামনি খাতুন। মুসলিম ঘরের মেয়ে। দুটো ভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়ের প্রেম কারোর সমাজই মেনে নেবে না, তা ওরা ভালো করেই জানতো। তবু শেষ চেষ্টা করছিল, যদি প্রেমটা টিকে যায়! দুজনেই তাদের পরিবারকে বুঝিয়েছিল ; সমাজে যে এর অনেক উদাহরণ আছে তাও তুলে ধরেছিল তাদের সামনে। কিন্তু কোনো কাজই হয়নি। বরং অশান্তির আবহেই চলছিল দিনগুলো। কিন্তু স্কুল শেষের পর কলেজে প্রবেশ করেও মামনি ও পলাশ জিইয়ে রেখেছিল তাদের সম্পর্কটা, খুব আলতোভাবে। 
তবুও নজরে এসেছিল আব্দুলদের। আব্দুল মামনির চাচাতো ভাই। বাড়িতে সে আবার তুলেছিল এই সম্পর্কের কথা। তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছিলেন মিনারুল শেখ। মামনির 'আব্বু'। মামনির চুলের মুঠি ধরে বলেছিলেন, 'তুই এখনো ঐ ছোকরার সঙ্গে লাইন মারোস? আমার কথা কানে ঢোকে নাই!'

মাথা নিচু করে চুপ করেছিল মামনি। কথা বলেনি।
------ কিরে, কথা কইস না ক্যান? হাউস লাগসে? হাউস? মিটাচ্ছি তোর হাউস।
তার পরেই ঘটলো কলেজ-মাঠের এই ঘটনাটা। পলাশ মার খাওয়ার পেছনে মিনারুল শেখের যে সায় ছিল, এটা শুধু পলাশ কেন, সবাই বুঝেছিল তখন। 

এ নিয়ে পলাশের বাড়িতেও যে কম অশান্তি হয়নি, তা নয়। বেশ বড়ো রকমের অশান্তি হয়েছিল। পলাশের পাশে তখন কেউ নেই। পলাশের বাবা তো বলেই বসলেন, 'তুই যদি আর না শুধরাস, আমি আর তোর মুখ দেখবো না। তোর জন্য আমাদের মান-সম্মান সব ধুলোয় মিশে গেল! পৃথিবীতে আর মেয়ে ছিলো না! ওসব সিনেমাতেই ভালো লাগে। বুঝলে? বাস্তবে না। জানবি, আমি এসবের মধ্যে নেই।' এরপর পলাশের মা'ও আর কোনো কথা বলেননি। ঠারেঠোরে তিনিও যে অসন্তুষ্ট, বুঝিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু তাঁর চোখের কোণে তখন জল চিকচিক করছিল। 

মাঝে দিন চারেক সব ঠিক ছিল। কোনো বাড়িতেই তাদের সম্পর্কটা নিয়ে কোনো শব্দ খরচ করতে দেখা যায়নি কাউকে। ঠিক পঞ্চম দিনের মাথায় দুই বাড়ি থেকেই নিখোঁজ হয়ে গেল দুজন, পলাশ আর মামনি!
 
পলাশের বাবা ব্যাপারটা আন্দাজ করে রাগে পলাশকে 'ত্যাজ্যপুত্র' করলেন! আত্মীয়স্বজন তাঁকে হাজার বুঝিয়েও সিদ্ধান্ত থেকে সরাতে পারলেন না।

এদিকে মামনির 'আব্বু' মিনারুল শেখ মেয়ের খোঁজে 'লোক' লাগালেন। নিজেও গেলেন সঙ্গে। খুব একটা বেগও পেতে হলো না তাঁকে। খোঁজ পেলেন মামনির, সঙ্গে পলাশকেও। অনেক দূরে, যেখানে একটা ক্লাবের আশ্রয়ে রয়েছে তারা। মেয়েকে ঘরে ফেরানোর জন্য অনেক কাকুতিমিনতি করলেন মিনারুল। কাজ হল না। সঙ্গী এনায়েত সাহেব বললেন, 'মিনারুল, তুমার মেয়ে ভালো মোতো ওয়াশ হইছে। যা বুঝলাম! অরে আর ফিরে পাবা না।' উনি তফাতে সরে গেলেন। 
মিনারুল হাল ছাড়লেন না। পলাশকে স্বধর্মে নিয়ে আসতে মেয়েকে নানাভাবে বোঝানো শুরু করলেন তিনি। কিন্তু তাতেও কোনো ফল দিলো না। শেষে বাড়ি ফিরে এলেন  খালি হাতে। কেননা ক্লাবের সেক্রেটারি আগে থেকেই বলে রেখেছিলেন, 'আপনারা কাউকে জোর করবেন না। ওরা এখন প্রাপ্ত বয়স্ক। ওরা যেটা চায়, আপনাদের সেটা মেনে নিতে হবে। ওরা এখন আমাদের আশ্রয়ে আছে। নাহলে আমরা কিন্তু থানার দ্বারস্থ হবো।'

।।২।।
মামনি-পলাশও সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলেছিল ------দুজনের কেউই ধর্মান্তরিত না হয়ে এক ছাদের তলায় থাকবে। একাজে পাশে পেল ক্লাবকে। দিব্যি দিন কাটাতে লাগলো তারা। কোনো অসুবিধা হল না কারও। ওদের এই সিদ্ধান্তকে শুভকামনা জানিয়ে পাশে থাকার আশ্বাস দিলেন এলাকার বেশ কয়েকজন শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষও। কুর্নিশ জানালেন তাদের সিদ্ধান্তকে। এগিয়ে এলেন এক প্রবীণ নাগরিক। ওদেরকে আশীর্বাদ করে বললেন, 'সাধারণ স্তরেও মানুষের চিন্তা-ভাবনার বদল ঘটছে। শেষ পর্যন্ত যে আমরা সবাই মানুষ, বুঝতে পারছেন কেউ কেউ!'
দিন যায়। মাস যায়। বছর যায়। ইতিমধ্যে মামনির কোল আলো করে এসেছে তিয়াস, ওদের একমাত্র পুত্র সন্তান৷ নানা সুখদুঃখভয়ের মধ্যে দিয়েও মামনি ও পলাশ চাইলো, ছেলেটা মানুষের মতো মানুষ হোক। দেখতে দেখতে সে ছেলে এবার নয়ে পড়েছে।

এদিকে হজে যাওয়ার সুযোগ এসেছে মিনারুলের। হজে যাওয়ার আগে একবার মামনিকে দেখতে ইচ্ছা করছিল তাঁর। সেইমতো বাড়িতে পাড়লেন কথাটা। বিবি রুখসানাও মেয়েকে দেখেননি কতো বছর! তাঁর কৌতূহল, মামনিকে দেখতে এখন কেমন হয়েছে। দুইজনেই কাউকে না জানিয়ে মামনিকে দেখতে যাওয়ার পরিকল্পনা করলেন। সেইমতো প্রায় ১০ বছর পর মামনির আব্বু ও আম্মু পা রাখলেন  'জামাই'-এর বাসাবাড়িতে। অনেক বদল চোখে পড়ল মিনারুলের। মেয়ের চেহারা, পোশাক-আশাক, ব্যবহার এমনকি ঘর-দোর পর্যন্ত। 
পুরনো অশান্তির সব কথা ভুলে থাকলো পলাশ। বাজার থেকে 'শ্বশুর' মশাইয়ের জন্য বড় দেখে একটা কাতলা মাছ আনল সে। খাসির মাংসও আনলো। সে শুনেছে, শাশুড়ি বিরিয়ানি খেতে ভালোবাসে । 
মামনি এখন ভালো বিরিয়ানি রান্না করা শিখে গেছে। সব ঐ ইউটিউব দেখে দেখে। অনেকদিন পর আব্বু, আম্মুকে নিজের হাতে রান্না করে খাওয়াবে মামনি। তাই তার আনন্দ যেন আর ধরে না! সে এখন রান্নাঘরে।

পলাশ এখন একটা মাইক্রোফিন্যান্স কোম্পানির এরিয়া ম্যানেজার। তার কাজের চাপ অনেক। ছুটিতে বাড়িতে থাকলেও কাজ নিয়ে বসতে হয় তাকে। অফিসের কাজ নিয়ে সে বসেছে পাশের ঘরে।
রুখসানা বিবি যাত্রাপথের ধকল সইতে পারেননি। তিনি  ভীষণরকম ক্লান্ত। ঘুমিয়ে আছেন খাটের পরে। এদিকে যোহরের নামাজ শেষ করে বারান্দায় নাতির সঙ্গে 'গল্প' করছেন মিনারুল। গল্পের মাঝখানে হঠাৎ তিনি নাতি তিয়াসকে কোলের কাছে টেনে নিলেন। একথা সেকথার পর তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে মিনারুল বললেন, 'দাদু, মা মরলি, পুড়াইও না কিন্তু, কবর দেও। বুঝলে? আর শোনো, কারুরে যেন কইও না কথাটা।'
কথাটা যেন একটু জোরে বলা হয়ে গিয়েছিল মিনারুলের!  রুখসানা ঘুমাচ্ছেন, তাঁর শোনার কথা নয়। পলাশ পাশের ঘরে কাজে বেশ ব্যস্ত। কিন্তু রান্নাঘর থেকে মামনি কথাটা  শুনতে পেল। 
ধীরে ধীরে সে দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো। আব্বু ঠিক কী বলেছে জানার জন্য ছেলেকে সে বললো, 'কি হয়েছে তিয়াস, কবর নিয়ে কি বললে যেন?'

----- আমি না, দাদুভাই-ই তো বলছিল, তুমি মরে গেলে তোমাকে কবর দিতে। 

মামনি আব্বুর দিকে তাকিয়ে ক্ষণিকের জন্য চুপ করে থাকলো। ঘাবড়ে গিয়ে মাথাটা নিচু করে ফেললেন মিনারুল, মামনির 'আব্বু'।
আড়চোখে একবার মিনারুলকে দেখে নিয়ে মামনি বললো, 'আব্বু, দেহটা আমি দান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পোড়াতেও হবে না, কবরও দিতে হবে না। বুঝলে?'

মামনির কথাটা শোনার পর আবারও মিনারুল মাথাটা নিচু করেই রইলেন। মাথা উঁচু করার সৎ সাহস যে নেই তাঁর! 



-----------------

বুধবার, ১৯ মার্চ, ২০২৫

অভাগীর সুখ (শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'অভাগীর স্বর্গ' গল্প অবলম্বনে রচিত।) : সুজয় চক্রবর্তী

অভাগীর সুখ : সুজয় চক্রবর্তী 



[১]
শত চেষ্টা করেও যখন একটা কাঠ  জোগার করা গেল না, তখন নদীর চরে গর্ত খুঁড়ে অভাগীকে শোয়ানো হল। অভাগীর মুখে আগুন দিয়ে তার শেষ ইচ্ছে পূরণ করলো কাঙালি। তারপর মরদেহে মাটিচাপা দিলো শ্মশানযাত্রীরা।

যে খড়ের আঁটি জ্বেলে কাঙালি মায়ের মুখে আগুন দিয়েছিল, তার থেকেই কুন্ডলী পাকিয়ে পাকিয়ে ধোঁয়া উঠছিল উপরে। গালে হাত দিয়ে বসে সেদিকেই তাকিয়ে ছিল সে। মা বলেছিলো, 'ও ধূঁয়া না বাবা, সগ্যের রথ'। মুখুয্যে বাড়ির গিন্নির মতো মা-ও তবে আকাশপথে রথে চড়েই সগ্যে যাচ্ছে! একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দু'হাতের চেটো দিয়েআ১ চোখদুটো মুছলো কাঙালি। হঠাৎ রসিক এসে পিঠে হাত রাখলো তার। মুখ তুলে রসিকের দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকলো কাঙালি। 'এই লোকটা তার বাবা!' অব্যক্ত এক প্রতিশোধ স্পৃহায় তার সর্বাঙ্গ যেন জ্বলে যাচ্ছিল। কিন্তু কোনও কথা বললো না সে। মৃত মায়ের মুখটা মনে পড়তেই আবারও চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো কয়েক ফোটা। রসিকের হাতটা এক ঝটকায় সরিয়ে নিয়ে চোখটা মুছে নিল সে। তারপরই ছুট দিলো সামনের আম বাগানের দিকে। রসিক ডাক দিল অনেক করে,---- ‘ কাঙালি,  শোন বাবা, শোন।' কিন্তু কে শোনে কার কথা। সে ডাক কাঙালির কাছে বড়ো অচেনা ঠেকলো। সাড়া দিল না সে। কিছুটা দূরে গিয়ে 'থু' করে একদলা থুতু ছিটিয়ে ফেললো মাটিতে। 

আজ সারাদিন শুধু মায়ের কথাই মনে পড়ছে কাঙালির। মা’র সঙ্গে ‘সগ্যে’ গেলেই মনে হয় সবচে ভালো হত। জল আর বাতাসা খেয়েই না হয় থাকতো। তবু তো মা’র পাশে শুয়ে রাজপুত্তুর, কোটাল-পুত্তুর আর পক্ষীরাজ ঘোড়ার গল্প শোনা যেতো! এর জন্য মা’র ওপর তার একটু অভিমানও হল। মা কি তাকে ‘সগ্যে’ নিয়ে যেতে পারতো না? সে এখন কার কাছে থাকবে? কোথায় থাকবে? মা ছাড়া তো এই পৃথিবীতে তার কেউ নেই ! কে তাকে আদর করে ডাকবে ----‘কাঙালি , আয় বাবা, আমার কাছে আয়। পান্তাভাত নুন লংকা দিয়ে মেখেছি, দুটো খেয়ে নে।' মা কত দুঃখ করে বলতো, ‘কাঙালি, তুই বড় হয়ে আমার সব আশা মিটাবি বাবা, সব। তোর বাবা তো আমার কথা কোনও দিন ভাবলোও না।' তারপরেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতো, 'জানি না। আমার যা কপাল! কোনও দিন সুখের মুখ দেখবো বলে মনে হয় না!...কাঙালি তখন মায়ের কথা কেড়ে নিয়ে বলতো, ‘তুমি চুপ করো না মা, আমি তো আছি!’ 

আর সেইজন্যই বেতের কাজটা শিখছিল কাঙালি। এভাবে আর বছর খানেক কাটিয়ে দিতে পারলেই মা'কে একটু 'সুখের মুখ' দেখাতে পারবে ভেবেছিল সে। কিন্তু সে সুযোগ আর হলো না! মা'ই দিলো না। তার খালি মনে হয় মা যদি কবিরাজের ওষুধগুলো ঠিকমতো খেতো, তাহলে সুস্থ হয়ে যেতো। কিন্তু খেলো না তো! দুলে-বাগদিরা মানুষ না? তাদের শরীর খারাপ হবে না? তবে ওষুধ কেন খেলো না, মা?  

মা’কে হারিয়ে আজ মন ভারাক্রান্ত কাঙালির। খুব দুঃখী মা তার। অনেক কষ্ট সহ্য করেছে এ জীবনে। বাবা যখন মাকে ফেলে রেখে পাশ কাটালো অন্য মহিলার সঙ্গে, তখনও মা মুখ বুজে পড়ে থেকেছে গ্রামেই। কোথাও যায়নি। আর কোথায় বা যাবে? নিজের বলতে তো আর কেউ ছিল না। শুধু কাঙালি। গ্রামের সব দুলে বউ-ই তাকে বড়ো ভালোবাসতো। তারা বলতো, 'তার মতো 'সতী-লক্ষ্মী' বউ পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।' অন্যের দুঃখে চোখের জল ফেলতো মা! রক্তের সম্পর্ক তো নেই-ই, কোনও ভাব-ভালোসার সম্পর্কও ছিলো না যাদের সঙ্গে, সেই বামুনদের গিন্নি মরলে যে মা কেঁদে ভাসায়, সে মা ভালো না হয়ে কি পারে? কিন্তু সবাই বুঝলেও কাঙালির আফসোস হয়, বাবা কেন তা বুঝলো না! না-কি বোঝার চেষ্টাই করলো না কোনও দিন। 
অনেকেই তো চেয়েছিল, কিন্তু একমাত্র কাঙালির জন্যই মা আর নিকে করেনি। কাঙালির মনে হয়, মা ভালোই করেছে নিকে না করে। মা যদি বাবার মতো নিকে করে অন্য গাঁয়ে চলে যেতো, তাহলে তো সে না খেয়েই মরে যেতো! তখন মা'কে জড়িয়ে ধরে গল্প শুনতো কে? কাজ কামাই করেও মা'র বুক ঘেঁষে শুয়ে রূপকথার গল্প শোনা যে কি আনন্দের তা শুধু কাঙালিই জানে। 

বাবার পায়ের ধুলো নিয়ে মা'র সগ্যে যাওয়ার শখ। কিন্তু কেন, মা, কেন! কী পেলে সারাজীবন? কিচ্ছু না। তোমার মৃত্যুর জন্য দায়ী যে লোকটা তার জন্য তোমার এতো ভক্তি কীসের? কেন তার পায়ের ধুলো! সে কি ভগবান? 
বাবার সামনে দাঁড়িয়ে আজ কতগুলো প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে ইচ্ছে করে কাঙালির। ---- মা থাকতে বাবা কেন আবার বিয়ে করেছে? আর বাবা হয়ে কাঙালির কোন আব্দারটাই বা সে রেখেছে? কিন্তু ইচ্ছে করলেও পারে না। মায়ের ছেলে যে সে! মা-ও পারতো না। মুখ বুজে থাকতো। তাই রসিক পাশে এসে দাঁড়ালে কাঙালি চুপ করে থাকলো।
অভাগীর অকাল মৃত্যু কাঙালিকে বাবা রসিকের কাছে নিয়ে এল বটে, তবে বেশ খানিকটা দূরত্ব রচনা করেই। একরাশ ঘৃণা ঝরে পড়লো কাঙালির ; বাবা রসিকের উপর, এই সমাজটার উপরেও । যে সমাজ জাত-পাতের দুয়ো দিয়ে মানুষের শেষ ইচ্ছে নিয়ে পরিহাস করে, কাঙালির ইচ্ছে করে ঘুণধরা এই সমাজটাকেই পুরো জ্বালিয়ে দিতে। আর জন্মদাতা পিতার খুব কাছে গিয়ে বলতে ইচ্ছে করে, ‘ তুমি একটা ঠগ, বুঝলে ? তুমি একটা ঠগ ‘।

[ ২ ]
বেতের কাজটা শিখছিল যখন ঠিক তখনই মা মারা গেল! আর সে কাজে আগ্রহ ছিল না কাঙালির। ছেড়ে দিয়েছিল।  

কাঙালি এখন নরেশ মিত্তিরের চালের আড়তে কাজ করে। নরেশবাবু লোকটা ভালো। মা-মরা ছেলেটার দুঃখ সহ্য করতে না পেরে নিজের আড়তেই কাজ জুটিয়ে দিয়েছেন। নরেশবাবুকে দেখে কাঙালির মনে হয় কিছু মানুষ এখনও আছে যাদের জন্য পৃথিবীটা এতো সুন্দর! যাদের পায়ের ধুলো মাথায় ছোঁয়ানো যায়।
টিফিন বাবদ রোজ পাঁচ টাকা মিলিয়ে মাসের শেষে কাঙালির হাতে থাকে প্রায় পঁচিশ'শ টাকার মতো। সৎভাই বিশুকে এবার দুর্গা পুজোয় নতুন জামা কিনে দেওয়ার কথা ভেবেছে কাঙালি। টাকা জমিয়ে জমিয়ে ইতিমধ্যে একটা পুরনো  সাইকেলও কিনে ফেলেছে সে। আড়তের কর্মচারী বৃন্দাবনের রেডিওটাও এখন কাঙালির জিম্মায়। বৃন্দাবন কাঙালিকে ছোট ভাইয়ের মতোই দেখে, তাই খুব কম দামেই দিয়েছে ওটা। বৃন্দাবন আরও কিছু জমিয়ে একটা টেপরেকর্ডার কিনেছে। রসিক বাড়ি থাকলে কাঙালির কেনা রেডিওটা চালিয়ে গান শোনে, শোনায় বিশুর মা’কেও।
রসিকের সংসারে এখন কাঙালির খুব কদর। কিছুদিন ধরে শুধু রসিক নয়, কাঙালির সৎ মা ও ভাই বিশুও তাকে বেশ সুনজরেই দেখছে। কাঙালি তার কারণটা বোঝে। তার শুধু মনে হয়, যদি মা বেঁচে থাকতো এখন, কতো আনন্দই না পেতো! মা বেঁচে থাকলে তার হাতে নতুন কাপড়ের প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে পরনের ছেঁড়া কাপড়টা বদলে আসতে বলতো কাঙালি। কিন্তু সেতো আর কোনও দিনই হওয়ার নয়! 
মাঝেমধ্যে রসিক যখন তার দ্বিতীয় গিন্নির সঙ্গে রসিকতায় মেতে ওঠে, কাঙালির তখন খুব মনে পড়ে মায়ের মুখটা। গালে হাত দিয়ে ভাবে ------মা’কি দেখতে সেই তেমনই আছে? মা কি এখনও তাকে ডাকে? সে ছাড়া মা'র যে আর কেউ নেই, কেউ ছিলো না কখনও।

[ ৩ ]
আজ নরেশবাবুর কাছ থেকে মাসের মাইনে হাতে পেয়ে খুশিতে মন ভরে গেল কাঙালির। প্রথমেই মনে পড়লো বিশুর কথা। বিশু কালকে মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খাওয়ার বায়না ধরেছিলো বাবার কাছে। আজ তাই বাজার থেকে একটু মাছ নিয়ে যেতে হবে বাড়িতে। নাহলে খারাপ দেখায়৷। হাজার হোক সে তো বয়সে ছোট!
মা মাছ খেতে বড়ো ভালোবাসতো। বিন্দিদের বাড়ি থেকে যখন মাছ ভাজার গন্ধ আসতো নাকে, তখন মা বলতো, 'কাঙালি, তুই তাড়াতাড়ি বড়ো হ' বাবা।  কাজ করে যখন টাকা নিয়ে আসবি বাড়িতে, তখন আমরাও মাছ খাবো। ওদের থেকে ভালো মাছ খাবো আমরা।' কাঙালি আপনমনে বিড়বিড় করলো, 'আজ বাড়িতে মাছ নিয়ে যাবো,মা। কিন্তু তুমিই তো নেই!' 
সন্ধ্যের দিকে মাছ বাজার থেকে পাঁচশো বাটা মাছ আর নিরঞ্জন ঘোষের দোকান থেকে পাঁচশো জিলিপি কিনে বাড়ি ফিরলো কাঙালি। 
রসিক আজ কাজে যায়নি। মানে কাজ হয়নি। রাজমিস্ত্রীর যোগাড়ে সে। ইদানিং প্রায়ই তার কাজ হচ্ছে না। বাড়িতেই ছিল। চারজনে একসঙ্গে বসে কাঙালির আনা জিলিপি খেল আনন্দ করে। রেডিওতে তখন গান চালিয়েছিল রসিক। খাওয়া-শেষে বিশুর মা মাছগুলো নিয়ে চলে গেল রান্নাঘরে। রসিক রেডিওটা নিয়ে নেমে গেল উঠোনে। 
একে তো চৈত্রের শেষ, তায় আবার গাছের পাতা একটাও নড়ছিল না। সারাদিনের ক্লান্তি তিন বালতি জলে মিটিয়ে নিলো কাঙালি। তারপর স্নান সেরে, চুল আচড়ে ঘরের দাওয়ায় এসে বসলো। সঙ্গে সঙ্গে কোথা থেকে বিশু এসে একটা হাতপাখা দিয়ে গেল কাঙালিকে! পাখার হাওয়া খাচ্ছিল কাঙালি। হঠাৎ তেল উঠে দপ্ দপ্ করতে করতে হ্যারিকেনটা গেল নিভে। 
হাতপাখাটা রেখে হ্যারিকেনটা নিয়ে বসলো কাঙালি। পাশে দাঁড়িয়ে টর্চের আলো ফেলছিল বিশু। এমন সময়ই রসিকের চিল-চিৎকার শোনা গেল। সঙ্গে সঙ্গে রান্নাঘর থেকে লম্প হাতে বেরিয়ে এল বউ। কাঙালিও তখন একছুটে বাইরে। ঠিক কাঁঠাল গাছটার নিচে শুয়ে ছটফট করছে রসিক। তার মুখ দিয়ে শুধু গ্যাজলা বেরচ্ছে। অন্ধকারেও পুরো ব্যাপারটা পরিস্কার হয়ে গেল। লম্পের আলোয় দংশনের জায়গাটা দেখেই আঁতকে উঠলো বউ। গ্রামের মেয়ে সে। সাপ চেনে। জাত সাপে কামড়েছে রসিককে!

রাতেই কাঙালি ছুটলো নবীন ওঝার বাড়ি। সাইকেলে প্রায় আধ ঘন্টার পথ সে পনেরো মিনিটে এসে পৌঁছালো! তারপর ওঝা এল বাড়িতে। ঝাড়ফুঁকও হল। কিন্তু রসিকের আর জ্ঞান ফিরলো না। 
রাতটা কাটলো কোনওরকমে। ভোর হতেই মরাকান্না শুনে ভিড় জমালো পড়শীরা। ঈশ্বর নাপিতের ছেলে বিভূতি এসে নাড়ী টিপে দেখলো। তারপর মাথা নাড়িয়ে জানান দিলো, সব শেষ! শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হল রসিককে। কাঙালি বড়ছেলে। নিয়মমতো তাই তাকেই মুখাগ্নি করতে হল। এরপর নদীর চরে গর্ত খুঁড়ে পুঁতে দেওয়া হল রসিকের দেহটাকে। মাটিচাপা দিল দুলে পাড়ার দু-একজন। সৎভাই বিশুর কাঁধে হাত রেখে ভরসা দিল কাঙালি ।
 হাত জোড় করে প্রণাম করে আকাশের দিকে তাকিয়ে কাঙালি মনে মনে বললো , ‘ মা, বাবাও দেখো সগ্যে যাচ্ছে, এবার তুমি সুখী হবে।'


* শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘অভাগীর স্বর্গ’ গল্প অবলম্বনে নবনির্মাণ। 

---------------

শনিবার, ৪ জানুয়ারি, ২০২৫

সুজয় চক্রবর্তীর অণুগল্প : যা ঠান্ডা!

 যা ঠান্ডা


সুজয় চক্রবর্তী 


অমিত খুব হিসাবী। সবাই জানে। বাজে পয়সা খরচ করে না। আড়ালে ওকে তাই কেউ কেউ 'কিপটে'ও বলে। কিন্তু পুজোর ছুটিতে বাড়ি এলে সবার জন্য এটা-ওটা নিয়ে এসে অন্যের কাছে নিজের 'সেই' ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার চেষ্টা করে। এবারও এনেছে। 

বাবার জন্য এনেছে একটা গায়ে দেওয়ার চাদর। বাবা তো আর ঠাকুর দেখতে যায় না! কবে থেকেই শয্যাশায়ী। চাদরটা হাতে নিয়ে বাবা বললো, 'অমু, আমার জন্য একটা লেপ করে দিবি, বাবা? গতবার যা ঠান্ডা পড়েছিল!' 

----- লেপ! কেন, কাঁথায় মানাচ্ছে না? ঠিক আছে, এখনও তো ঠান্ডা সেভাবে পড়েনি, করে দেবো।

ছুটি শেষে বাবার জন্য একটা লেপ করে দিয়ে গেল অমিত। 

কর্মসূত্রে অমিত পুনেতে থাকে। রোজই নিয়ম ক'রে বাড়িতে ফোন করে সে। 


আজ ফোন করতে ভালো-মন্দ জানার আগেই বউ বলে উঠলো, 'জানো, বাবার না শ্বাস উঠছে ঘনঘন। হাঁপের টানটা সকাল থেকে আরও বেড়েছে। জানি না কোন ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো।' 

----- কোন ডাক্তার দেখাবে আমি এখান থেকে কী করে বলবো! যেটা ভালো হয়, ক'রো। আর শোনো, লেপটা বাবার গা থেকে সরিয়ে নিয়ো, বুঝলে?  বলা তো যায় না, যা ঠান্ডা! 


-----------

বৃহস্পতিবার, ২ জানুয়ারি, ২০২৫

সুজয় চক্রবর্তীর সঙ্গে বিল্লাল হোসেন

অণুগল্প বিষয়ে সুজয় চক্রবর্তীর সাক্ষাৎকার

 

বিশ্বসাহিত্যে অণুগল্প নানা নামে নিয়মিতই চর্চা হচ্ছে । একেক দেশে এর একেক নাম । একেক ধরণ। এ-ও বলা দরকার যে, সেসব বাহারি নামের অণুগল্প কোন প্রকার থিউরি বা তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সুনির্দিস্ট লেখনশৈলী, অবকাঠামো  ,সংজ্ঞা-কে কেন্দ্র করে হয়ে ওঠেনি। ফলে অণুগল্প বা অণুগল্পের সাদৃশ্যমূলক  ছাড়াছাড়া এইসব অণুগল্প, অণুগল্পের সারাৎসার হিসেবে শুধু‘স্বল্পায়তন’-কে মেনে নিয়েছে। লেখকদের মধ্যে আর কোন সাযুজ্য খুঁজে পাওয়া যায় না। আবার, এ-স্বল্পায়তনের ধারণাও একেক লেখকের কাছে একেক রকম ।

অন্যদিকে, বাংলাভাষাতেও অণুগল্প চর্চা হচ্ছে । তবে এই চর্চার পেছনে কিছু  সংবিধিবদ্ধতা কাজ করছে । একটি অণুগল্পের সৌন্দর্যবিকাশে কিছু কিছু শৈলী / অবকাঠামো/ সংজ্ঞা নিরূপণ করে লিখিত হচ্ছে অণুগল্প । এবং ‘অণুগল্প’ গ্রুপকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একদল অণুগল্পকার ।  ‘স্বল্পায়তন , বহুস্বর , রহসয়ময়তা , শুরুর ম্যাজিক , বিস্ময় পরিণতি , যতিচিহ্ন , উল্লম্ফন , বিষয়বস্তু , কমপ্যাক্ট , টুইস্ট/ মোচড়/অভিঘাত— অণুগল্পের এইসব উপাদানকে সামনে রেখে লিখিত হচ্ছে একেকটি সার্থক অণুগল্প । আর এইভাবে বাংলাসাহিত্যে অন্যান্য শাখার মত [ কাব্য , ছোটগল্প , প্রবন্ধ , উপন্যাস ] অণুগল্প একটি স্বতন্ত্র শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে । যার উদাহরণ আপনার সম্পাদিত পত্রিকা । আমরা লক্ষ্য করেছি, অন্যান্য বিভাগের মত সম্পুর্ণ আলাদা বিভাগ করেই অণুগল্পকে স্থান করে দিয়েছেন।

(সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিলাল হোসেন)।
....................................................................................................


প্রশ্ন-১
অণুগল্পের প্রতি আপনার এই ভালবাসা/ মমত্ববোধের কারণ কি ?

উত্তর : কারণটা খুবই সোজা। বার বার যার কাছে নিজেকে সঁপে দিই, তাকে না ভালোবাসলে তো সেটা সম্ভবই হত না, তাই না!  'মাথার ভেতর যে বোধ' কাজ করে, তা ব্যক্ত করতে তো অণুগল্পকেই আশ্রয় করি। সেই থেকেই তার প্রতি এক প্রকার মমত্ববোধ গড়ে উঠেছে। আর যাকে ভালোবাসি, তার সঙ্গে চলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।

প্রশ্ন-২ বাংলাসাহিত্যে একটি স্বতন্ত্র শাখা হিসেবে ‘ অণুগল্প’ আবির্ভুত হতে যাচ্ছে । আপনার কাছে কেন মনে হয় , কোন কোন কারণে  কবিতা , ছোটগল্প ,প্রবন্ধ্‌, ছড়া –এইসব শাখার পাশাপাশি অণুগল্প স্বতন্ত্র শাখা হয়ে উঠবে/ উঠছে?

উত্তর : অণুগল্পকে স্বতন্ত্র শাখা না বলে একটা আলাদা 'আর্ট-ফর্ম' বলা যেতে পারে। কেননা অণুগল্প তো শুধু আজকের রূপভেদ নয়। আধুনিক অণুগল্পের জন্মই হয়েছে প্রায় একশো  বছর আগে। তখন 'অণুগল্প' শব্দদ্বয়ের প্রচলন ছিল না, এই যা। রবীন্দ্রনাথ, বনফুলের লেখা তো তারই প্রমাণ দেয়। বিদেশে তারও আগে। তাই হঠাৎ করে এটা একটা 'শাখা' হয়ে উঠছে না। প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল অনেক আগে থেকেই। এদেশে সলতে পাকানোর পর্বটা করে গিয়েছিলেন, রবীন্দ্রনাথ, বনফুল থেকে শুরু করে মানিক, শৈলজানন্দ প্রমুখ।

তবে কথাসাহিত্যে কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাসের পাশাপাশি অণুগল্পও তার স্বতন্ত্র জায়াগা করে নিতে পেরেছে, এটা এক বাক্যে সবাই স্বীকার করবেন। আসলে ইদানীং অণুগল্প বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কেননা শুধু অণুগল্পকে কেন্দ্র করেই একাধিক ছোট পত্রিকা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে চলেছে।  প্রবীণ লেখকরাও এখন অণুগল্প লিখছেন। কমার্শিয়াল পত্রিকাও এখন অণুগল্প ছাপছে। কারণটা আর কিছুই নয়, তা হল সময়। পাঠক চাইছেন খুব অল্প সময়ে সাহিত্যের রসাস্বাদন করতে। আর তাই হাতে তুলে নিচ্ছেন ক্ষুদ্র পরিসরের এসব গল্পগুলোকে।

প্রশ্ন-৩
৩) বাংলাদেশের জাতীয় পর্যায়ের দৈনিক ও সাহিত্য পত্রিকায় এখনও নিয়মিত ভাবে অণুগল্পের জন্য কোন আলাদা জায়গা বরাদ্দ করা হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে আমরা কী করতে পারি?

উত্তর : পূর্ববঙ্গে না হলেও পশ্চিমবঙ্গে বেশ কিছু জাতীয় পর্যায়ের দৈনিকে বা সাহিত্য পত্রিকাতে অণুগল্প ছাপা হচ্ছে। সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে অণুগল্পের জন্য বরাদ্দ থাকছে নির্দিষ্ট পৃষ্ঠাও।

বাংলাদেশে এটা করতে গেলে বর্তমানের জনপ্রিয় লেখক যারাঁ আছেন, তাদেরঁ দিয়ে অণুগল্প লিখিয়ে নিতে হবে। কেননা, তারাঁ কমার্শিয়াল পত্রিকার পরিচিত মুখ। তারাঁ যদি অণুগল্প লেখেন, তবে বড়ো প্রকাশনাগুলো অণুগল্প বিষয়ে আগ্রহী হবেন বলেই আমার বিশ্বাস। আর এই বড়ো প্রকাশনা থেকেই তো জাতীয় পর্যায়ের বেশির ভাগ দৈনিকগুলো বের হয়, তাই না?

প্রশ্ন-৪
আপনার সম্পাদিত ছোটকাগজে অণুগল্প বিষয়ক ‘একটি অণুগল্প সংখ্যা’ বের করার কোন পরিকল্পনা আছে কি ?

উত্তর : আমার সম্পাদিত পত্রিকা 'পারক', গল্প ও গল্প বিষয়ক পত্রিকা। তেরো বছর পূর্ণ করলো। পত্রিকার সব সংখ্যাতেই ছোটগল্প, অণুগল্প, গল্প বিষয়ক প্রবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও গল্পের বইয়ের আলোচনা থাকে। তবে প্রতিটা সংখ্যাতেই অণুগল্পের উপরে বিশেষ জোর দিই। তাছাড়াও ২০১২  সালের শারদ সংখ্যা 'অণুগল্প সংখ্যা' হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। ভবিষ্যতেও 'অণুগল্প সংখ্যা' করার ইচ্ছে আছে।

প্রশ্ন-৫
বিশ্বসাহিত্যে অণুগল্প আজ একটি জনপ্রিয় ও প্রতিষ্ঠিত ধারা । এবিষয়ে বুকার/ নোবেল পুরস্কারও কেউ কেউ পেয়েছেন ।অথচ আমাদের দেশে অণুগল্প বিষয়ে অনেকেই উন্নাসিকতা দেখাচ্ছেনই শুধু না বিরোধিতাও করছে ,নীরবে/ সরবে । এবিষয়ে আপনার অভিমত কি ?

উত্তর : কে কি বললো, এ নিয়ে না ভেবে আমরা যারাঁ অণুগল্প চর্চা করি, তা নিবিষ্ট মনে করে যেতে হবে। আমিও অনেককে বলতে শুনেছি, 'অণুগল্প এক প্রকার ফাঁকিবাজি সাহিত্য রচনা।' এটা যারাঁ বলেন, তারা অণুগল্প কি, সেটাই জানেন না। অণুগল্প লেখা খুব কঠিন। যারাঁ সেটা পারেন না, আমার মনে হয় একমাত্র তারাই অণুগল্পের বিরূপ প্রচার করেন।

প্রশ্ন-৬
অণুগল্পের ভবিষ্যৎ কি রকম ?

উত্তর : ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা না হয়েও বলা যায়, অণুগল্পের ভবিষ্যৎ বেশ উজ্জ্বল। সময়ের দাবি মেনেই অণুগল্পের এত জনপ্রিয়তা।  আমার তো মনে হয়, একটা সময় শুধু অণুগল্পই মানুষ পড়বে। সে শুধু সময়ের অপেক্ষা।





         ----------


মুখোমুখি : সুজয় চক্রবর্তী


অল্প কথার কোলাজ পত্রিকায় প্রকাশিত সুজয় চক্রবর্তীর সাক্ষাৎকার

----------------------------------------


পত্রিকা: আপনার মতে অণুগল্প কি?

সুজয় : 'অণু' মানে ক্ষুদ্র, তাই তো? যে গল্প অতিশয় ক্ষুদ্র, অথচ খাঁটি গল্প, তাকেই অণুগল্প বলা চলে। স্বল্প শব্দ প্রয়োগে, যতটা সম্ভব বাক্য সংকোচন করে অণুগল্প লেখা হয়। খুব ছোট্ট করে হলেও একটা 'গল্প' যেন তাতে থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হয়। কেননা পাঠক শেষ পর্যন্ত গল্প চায়। বলাযায়, অণুগল্প একটা স্ফুলিঙ্গের মতো। একটা ঝলকানি। যা ক্ষণিকের জন্য স্থায়ী হবে, কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীকে তা প্রবলভাবে নাড়া দিয়ে চলে যাবে। যার রেশ থাকবে অনেকক্ষণ। যারা মনে করেন অণুগল্প লেখা সহজ, তাদের বলি অণুগল্প লেখা সবচেয়ে কঠিন। কি লিখব, কতটুকু লিখব, সেই বোধ যদি না থাকে, তবে তা আর যাইহোক অণুগল্প হবে না। একটা কথা দশটা না বলা কথার যে জন্ম দিতে পারে, তা সার্থক অণুগল্প পাঠেই বোঝা যায়। পাঠককে বিন্দুতে সিন্ধু দর্শন করাতে পারে একমাত্র অণুগল্পই। অণুগল্পের শেষ লাইনটাই হল পুরো গল্পের টার্নিং পয়েন্ট। পাঠকের জন্য একটা চমক থাকে সেখানে।


পত্রিকা : আচ্ছা। তাহলে ছোট গল্পের সঙ্গে এর পার্থক্য কোথায়?

সুজয় : ছোটগল্পের সঙ্গে অণুগল্পের পার্থক্যটা বেশিরভাগটাই ব্যাকরণগত। সরল অথচ ক্রিয়াপদহীন বাক্য, অসমাপিকা যুক্ত বাক্যের ব্যবহার অণুগল্পেই বেশি দেখা যায়। অন্যদিকে ছোটগল্পে সংলাপের প্রাধান্য থাকলেও অণুগল্প সংলাপহীনও হতে পারে। আবার অণুগল্পে উপমা ব্যবহারের চল খুব।
তাই বলে এই নয়, ছোটগল্পের ডালপালা ছেটে দিলেই সেটি অণুগল্প হয়ে যায়। কতটুকু লিখতে হবে, আর কতটুকু লেখার প্রয়োজন নেই, কিংবা কোথায় থামতে হবে, সেটা না জানলে কিন্তু অণুগল্প লেখা সম্ভবই না। ছোট ক্যানভাসে একটা বৃহৎ প্রেক্ষাপটকে ধরার চেষ্টা থাকে সেখানে।

এক্ষেত্রে আকার-আয়তনের প্রশ্নটি চলে আসবে। যদিওএ নিয়ে নানা মত আছে। তবে আমি মনে করি, পঞ্চাশ থেকে তিনশো শব্দের মধ্যে (খুব বেশি হলে সাড়ে তিনশো) যথার্থভাবে যদি গল্পটিকে তুলে ধরা যায়, তাহলে সেটি অণুগল্প। কিন্তু যা বলতে চেয়েছি, তা যদি তার বেশি শব্দের সাহায্য নিতে হয়, তাহলে সেটি আর 'অণু' থাকে না। 'ছোটগল্প' বলতে হয় তাকে। অণুগল্প লেখার সময় শেষটা আগে ভেবে রাখলে পাঠককে উৎকৃষ্ট অণুগল্প উপহার দেওয়া সম্ভব।

পত্রিকা : বেশ। অণুগল্প লেখার সময় আপনি বিষয়বস্তু কিভাবে নির্বাচন করেন?

সুজয় :  সব সময় বিষয়বস্তু নির্বাচন করে অণুগল্প লেখা সম্ভব হয়ে ওঠে না। অনেক সময় 'হঠাৎ'ই কোনও বিষয়ও আমার কাছে এসে ধরা দেয়। পারিপার্শ্বিক বা সমসাময়িক কোনও ঘটনা, চরিত্র, যা আমাকে নাড়া দেয়, তাকেই তখন বিষয় করে তুলি।


পত্রিকা : অণুগল্প লিখতে কেমন লাগে? লিখে সৃষ্টিসুখ পান?

সুজয় : অণুগল্প লিখতে ভালোই লাগে। ভালো না লাগলে লিখবো কেন? অণুগল্পে নিজেকে সচ্ছন্দবোধ করি বলেই তো যা ভাবি, তা অণুগল্পতেই তুলে ধরার চেষ্টা করি। তবে এটাও বলি, শুধু অণুগল্পই না, বেশ কিছু ছোটগল্পও আমি লিখেছি। সেগুলো প্রকাশিতও হয়েছে নানা বাণিজ্যিক - অবাণিজ্যিক পত্রিকাতে। এখন বই আকারে কবে সেটা পাঠকের হাতে তুলে দিতে পারছি, সেই অপেক্ষায় আছি।


পত্রিকা : বাংলা সাহিত্যে অণুগল্পকে আপনি কেমন স্থানে রাখেন?

সুজয় : বাংলা সাহিত্যে অণুগল্পের স্থান পাকা। 'সে' নিজেই তার স্থান দখল করে বসে আছে। আমার বলা না বলার উপরে 'তার' কিছু এসে যায় না। আসলে অণুগল্প তো আজকের ফসল না। অণুগল্প আগেও ছিল। শুধু 'অণু' নামটাই ছিল না। এইসব অতি স্বল্প পরিসরে রচিত গল্পকে কেউ কেউ তখন বলেছেন, গল্পিকা, কেউ বলেছেন, গল্পস্বল্প, কেউ বলেছেন, 'পোস্টকার্ড সাইজ' গল্প। বর্তমানে 'অণু' শব্দটি বহুল প্রচলিত, এই যা। বেঁচে থাকলে সাহিত্যিক বনফুলকেও এখন 'অণুগল্পকার' হিসেবে সম্বোধন করা হত। কেননা তারঁ বেশিরভাগ গল্প তো যথার্থ অণুগল্পই। তাই না? সত্তরের দশকের আগে পর্যন্ত পাঠক এগুলোকে গল্প হিসেবেই নিয়েছে। পরবর্তীতে 'পত্রাণু' আসার পর থেকে ধারণা পাল্টাতে থাকে।

এটুকু বলতে পারি, যতদিন যাচ্ছে অণুগল্পের প্রাসঙ্গিকতা বাড়ছে বই কমছে না। এখন পাঠকের হাতে সময় কম। বড়ো লেখা ধৈর্য ধরে কেউ পড়তে চায়ছেন না। সেইজন্যই তো প্রয়োজন হয়ে পড়েছে অণুসাহিত্যের। লেখা হচ্ছে অণুকবিতা, অণুরম্য, অণুপ্রবন্ধ এমনকি অণুউপন্যাস!

তবে একটা কথা, বেনোজল সব ক্ষেত্রেই ঢুকছে। সাহিত্যও এর ব্যতিক্রম নয়। সিরিয়াস পাঠকের নজরে সেইরকমই কিছু লেখা চলে এলে অণুগল্প সম্পর্কে একটা ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হচ্ছে। কেউ কেউ তো বলেই দিচ্ছেন, 'অণুগল্প হল এক ধরনের ফাঁকিবাজি সাহিত্যরচনা। 'সোস্যাল মিডিয়ায় চটজলদি কিছু লিখে অণুগল্প নাম দিয়ে তা চালিয়ে দিতে কারওর তো আর মনোনয়নের দরকার হয় না! তখন ঐ 'ভুষিমাল'গুলো সচেতন পাঠককে অণুগল্প সম্পর্কে এই ধারণার জন্ম দিচ্ছে। অণুগল্প লিখতে গেলে সাধনা দরকার। পড়াশোনা দরকার।


পত্রিকা : বর্তমান অণুগল্পকারদের মধ্যে আপনি কার কার লেখা পছন্দ করেন?

সুজয় : অনেকের লেখাই পছন্দ করি। সমসাময়িক অনেকেই খুব ভালো অণুগল্প লিখছেন। তাদের লেখা পড়ে অনেক কিছু শেখারও  আছে। এক ঝটকায় কিছু নাম বলে দিলে, আড়ালে থেকে যাবেন অনেক খ্যাতিমান অণুগল্পকার। তবে এটাও ঠিক যাদের লেখা পছন্দ করি তাদের সব লেখাই যে সবসময় ভালো লেগেছে, তাও  নয়। তবু বলবো, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বনফুলকে আমরা পাইনি। আমরা পেয়েছি স্বপ্নময় চক্রবর্তীকে। বর্তমানের একজন অন্যতম সেরা অণুগল্পকার তিনি।


পত্রিকা : আপনার কি মনে হয় অণুগল্প গল্পের সৃজনশীলতা নষ্ট করছে?

সুজয় : অণুগল্প কেন গল্পের সৃজনশীলতা নষ্ট করবে? এগুলো যারা রটায়, আমার মনে হয় তারা অণুগল্প কী, তা জানেনই না। আপনার মনের ভাব কখন কোন ফর্মে বা শেপে ধরা দেবে, তা আগে থেকে কি বলে দেওয়া সম্ভব?  কখনও তা গদ্যে ধরা দিতে পারে, কখনও তা পদ্যে। তাহলে আর কবিরা গল্প লিখতেন না। শক্তি চট্টোপাধ্যায়,  জীবনানন্দ দাশ, এমন কত কবি গল্প লিখেছেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কবিতা লিখেছেন। আসলে আপনি যা বলতে চায়ছেন, তার জন্য কোন মাধ্যমের আশ্রয় নেবেন, তা নিজেকেই ঠিক করে নিতে হবে। কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটকের মতোই 'অণুগল্প'ও একটা মাধ্যম বা রূপ।

তবে চরিত্রগত দিক থেকে অণুগল্প কবিতার খুব কাছাকাছি, এটা বলা যায়। কেননা অণুগল্পের শরীর জুড়ে একটা কাব্যিক দ্যোতনা থাকে। একটা ঘটনা বলি, বেশ কিছুদিন আগে ফেসবুকে একটা অণুগল্প পোস্ট করেছিলাম। উত্তরবঙ্গের এক আবৃত্তিশিল্পী বন্ধু সেটি পড়ে আমার কাছে তা আবৃত্তি করার অনুমতি চান। আমি তাকে বলি, দাদা, এটাতো অণুগল্প! উনি বলেন, অণুগল্প হলেও এটাতে যে লিরিক আছে, তাতে আমার আবৃত্তিযোগ্য কবিতাই মনে হয়েছে। আমি আর না করিনি। এই প্রসঙ্গে আরও একটা মজার ঘটনা আছে, ২০১৬ সালের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা বইমেলাতে আর সকলের সঙ্গে আমিও এক কবি সম্মেলনে হাজির ছিলাম। আসলে আমার সাহিত্যবন্ধুদের বেশিরভাগই কবিতা লেখেন। তবে কবিতা যে আমি কোনও দিন  লিখিনি, তা নয়, কিন্তু  প্রায় ন'-দশ বছর আর লিখি না। তো, আমার এক শুভানুধ্যায়ী বন্ধু কোন ফাঁকে আমার নামটি মঞ্চের ঘোষকের কাছে বলে আসেন। অণুগল্পকার হিসেবে। আমি জানতাম না। কিন্তু মঞ্চে ঘোষক আমাকে আমন্ত্রণ করে বসলেন কবিতা পাঠের জন্য! অত লোকের মাঝখানে শেষে স্টেজে উঠতেই হল। এক মুহূর্ত না ভেবে যথারীতি একটা অণুগল্পই পাঠ করে বসলাম। গল্প পাঠের শেষে হাততালিও মিললো। স্টেজ থেকে নেমে দর্শকাসনে বসতেই একজন বললেন, আপনি আবার কবিতা লেখা শুরু করলেন না কি? বেশ হয়েছে। বললাম, দাদা, ওটা অণুগল্প ছিল। উনি তো থ'। বললেন, সবাইকে বোকা বানালেন! সত্যিই কেউ ধরতে পারেননি।


পত্রিকা : আপনার লেখা অণুগল্পের বইগুলি সম্বন্ধে কিছু বলুন।

সুজয় : আমার প্রথম অণুগল্প বের হয় আমারই সম্পাদিত 'পহিল' পত্রিকাতে, ২০০৩ সালে। তারপর থেকে পশ্চিমবঙ্গ ও বহির্বঙ্গের অসংখ্য পত্রিকাতে আমি অণুগল্প লিখেছি, এখনও লিখছি। কিন্তু দুই মলাটের মধ্যে অণুগল্পগুলো একত্রিত করার ভাবনা কোনও দিনই আসেনি। তবে এ যাবৎ বহু সংকলনে আমার অণুগল্প ঠাঁই পেয়েছে। গত বছর 'দুই দুগণে এক' নামে একটা অণুগল্পের বই  হঠাৎই বার করি ফেলি লেখক শাঁওলি দের সঙ্গে, যুগ্ম ভাবে। প্রকাশক : ইসক্রা। আর এবছর 'বালাই ষাট' নামে ষাটটি অণুগল্পের আমার একক বই বেরোলো, 'আকাশ' প্রকাশনী থেকে। বই দুটিতেই সমকালীন সমাজ জীবনের এক ফটোগ্রাফিক ছবি তুলে ধরার চেষ্টা করেছি, কতোটা পেরেছি, তা পাঠক বলবে, সময় বলবে।


পত্রিকা : যারা অণুগল্প নিয়ে কাজ করতে চায় তাদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।

সুজয় : অণুগল্প নিয়ে যারা কাজ করতে চান, তাদের উপদেশ দেওয়ার মতো জায়গায় এখনও আসিনি আমি। তবে এটুকু বলতে পারি, লক্ষে অবিচল থাকতে হবে। কেননা অনেকেই কান ভাঙাবে, অণুগল্প গল্পের প্লটটাকে মেরে ফেলে। তাই গল্প লেখাই শ্রেয়। অণুগল্প কি ও কেন, জানা থাকলে এক্ষেত্রে কাজ করতে সুবিধা হবে। শুধু অণুগল্প নিয়েই কাজ করছে পশ্চিমবঙ্গের, বহির্বঙ্গের একাধিক ছোট  পত্রিকা। যেমন,  এই মুহূর্তে মনে পড়ছে অণুপত্রী, অল্প কথায় গল্প পত্রিকা, অণুরণন, অণুগল্প পত্র, গল্প ইদানীং, কফি হাউস, অল্প কথার কোলাজ, সাহিত্য লহমা, হঠাৎ আলো, গল্পাণু, বাংলাদেশের 'অনুভূতি'। এছাড়াও কিছু ছোট পত্রিকাও আছে, যারা অণুগল্প নিয়ে কাজ করছে.... গল্পগুচ্ছ, ইসক্রা, অলিন্দ, ক্রন্দসী,  পারক, এরকম কতো পত্রিকা! তবে বাণিজ্যিক পত্রিকাগুলোও ইদানীং অণুগল্প প্রকাশ করছে। বর্তমান সময়ে অণুগল্প যে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে তা তারা বুঝতে পারছে।

শুধু অণুগল্প লিখেই যে বাংলা সাহিত্যে জায়গা পাকা করা যায়, তা তো স্বয়ং বনফুলই দেখিয়ে গেছেন। স্বনামধন্য লেখক স্বপ্নময় চক্রবর্তীও অণুগল্পের প্রাসঙ্গিকতা উপলব্ধি করে শুধুমাত্র অণুগল্পের উপরেই একটা বই লিখে ফেলেছেন! এছাড়াও অসংখ্য অণুগল্প লিখেছেন সমসাময়িক বর্ষীয়ান সাহিত্যিক সাধন চট্টোপাধ্যায়, রমানাথ রায়, অমর মিত্র, তপন বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ। এঁদের অণুগল্প পড়লে অণুগল্প চর্চা আরও মজবুত হবে, এই বিশ্বাস আছে।




             ধন্যবাদ।





---------------------------------------------------