সোমবার, ২৪ মার্চ, ২০২৫

সুজয় চক্রবর্তীর গল্প : যেজন আছে মাঝখানে



ক্রমাগত হুমকির শিকার হচ্ছিল পলাশ। দাঁতে দাঁত চেপে এতদিন সব সয়ে যাচ্ছিল। এছাড়া তার আর কিছু করারও ছিল না। কিন্তু আজ যখন গায়ে হাত দিলো আব্দুলরা, ঘুষি দিয়ে মুখ ফাটিয়ে দিলো, তখনই সে স্থির করে নিয়েছিল আর পড়ে পড়ে মার খাওয়া যাবে না। পালাবে। তবে একা নয়, দুজনে।  

কলেজের ফাইনাল পরীক্ষা শেষ। বিকেলবেলা। আব্দুলদের পাঁচজনের দলটা ওকে যখন মারতে মারতে কলেজের মাঠের মাঝখানে নিয়ে গেল, তখন পলাশের গলার টুঁটি চেপে ধরে আব্দুল বলছিল, 'কাল থেকে তোকে যেন এলাকায় না দেখি। তাহলে কিন্তু ফল ভালো হবে না বলে দিচ্ছি।' পলাশ কিছু বলতে পারেনি। বলার চান্সই পায়নি। 

সারা কলেজ তখন হইহই রইরই অবস্থা। এলাকার প্রায় সব লোক ছুটে এসেছে সেখানে। কিন্তু কেউ আব্দুলদের হাত থেকে পলাশকে বাঁচানোর কোনো উদ্যোগই নিল না!  আসলে আব্দুলদের চেনে না, এলাকার খুব কম মানুষই আছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মার খেল পলাশ। ওর হয়ে কেউ বলবার ছিলো না তা নয়, বলেওছিল একজন, সে জাফর, 'ওই তোরা ওকে ছাড়। এই পলাশ শোন, মামনিকে যদি ভালোবাসিস, মামনিকে যদি বিয়ে করতে চাস, তাহলে মুসলমান হয়ে যা। কোনো বাঁধা থাকবে না। তখন তোর গায়ে হাত দেয় কোন কুত্তার বাচ্চা!' হাতের চেটো দিয়ে তখনও রক্ত মুছছে পলাশ। কোনো কথা বলেনি।

গণ্ডগোলের শুরু স্কুল থেকেই। কলেজে এসে সেই আগুনে ঘি পড়ছে শুধু। কো-এড স্কুলে ছেলেমেয়েদের মধ্যে একটু-আধটু প্রেম-টেম হয়। চিরকাল তা হয়েই আসছে। সব জায়গায়। তাই বলে একেবারে চিপকে যাওয়া কেস, এর আগে নিরঞ্জন ঘোষ স্মৃতি বিদ্যাপিঠে হয়নি, যেটা মামনি আর পলাশের মধ্যে হয়েছিল! কাঁঠালের আঠা নয় যে তেল দিলে উঠে যাবে। এ যেন ফেভিকুইক! পলাশরা দত্ত। কায়স্থ। মামনি খাতুন। মুসলিম ঘরের মেয়ে। দুটো ভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়ের প্রেম কারোর সমাজই মেনে নেবে না, তা ওরা ভালো করেই জানতো। তবু শেষ চেষ্টা করছিল, যদি প্রেমটা টিকে যায়! দুজনেই তাদের পরিবারকে বুঝিয়েছিল ; সমাজে যে এর অনেক উদাহরণ আছে তাও তুলে ধরেছিল তাদের সামনে। কিন্তু কোনো কাজই হয়নি। বরং অশান্তির আবহেই চলছিল দিনগুলো। কিন্তু স্কুল শেষের পর কলেজে প্রবেশ করেও মামনি ও পলাশ জিইয়ে রেখেছিল তাদের সম্পর্কটা, খুব আলতোভাবে। 
তবুও নজরে এসেছিল আব্দুলদের। আব্দুল মামনির চাচাতো ভাই। বাড়িতে সে আবার তুলেছিল এই সম্পর্কের কথা। তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছিলেন মিনারুল শেখ। মামনির 'আব্বু'। মামনির চুলের মুঠি ধরে বলেছিলেন, 'তুই এখনো ঐ ছোকরার সঙ্গে লাইন মারোস? আমার কথা কানে ঢোকে নাই!'

মাথা নিচু করে চুপ করেছিল মামনি। কথা বলেনি।
------ কিরে, কথা কইস না ক্যান? হাউস লাগসে? হাউস? মিটাচ্ছি তোর হাউস।
তার পরেই ঘটলো কলেজ-মাঠের এই ঘটনাটা। পলাশ মার খাওয়ার পেছনে মিনারুল শেখের যে সায় ছিল, এটা শুধু পলাশ কেন, সবাই বুঝেছিল তখন। 

এ নিয়ে পলাশের বাড়িতেও যে কম অশান্তি হয়নি, তা নয়। বেশ বড়ো রকমের অশান্তি হয়েছিল। পলাশের পাশে তখন কেউ নেই। পলাশের বাবা তো বলেই বসলেন, 'তুই যদি আর না শুধরাস, আমি আর তোর মুখ দেখবো না। তোর জন্য আমাদের মান-সম্মান সব ধুলোয় মিশে গেল! পৃথিবীতে আর মেয়ে ছিলো না! ওসব সিনেমাতেই ভালো লাগে। বুঝলে? বাস্তবে না। জানবি, আমি এসবের মধ্যে নেই।' এরপর পলাশের মা'ও আর কোনো কথা বলেননি। ঠারেঠোরে তিনিও যে অসন্তুষ্ট, বুঝিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু তাঁর চোখের কোণে তখন জল চিকচিক করছিল। 

মাঝে দিন চারেক সব ঠিক ছিল। কোনো বাড়িতেই তাদের সম্পর্কটা নিয়ে কোনো শব্দ খরচ করতে দেখা যায়নি কাউকে। ঠিক পঞ্চম দিনের মাথায় দুই বাড়ি থেকেই নিখোঁজ হয়ে গেল দুজন, পলাশ আর মামনি!
 
পলাশের বাবা ব্যাপারটা আন্দাজ করে রাগে পলাশকে 'ত্যাজ্যপুত্র' করলেন! আত্মীয়স্বজন তাঁকে হাজার বুঝিয়েও সিদ্ধান্ত থেকে সরাতে পারলেন না।

এদিকে মামনির 'আব্বু' মিনারুল শেখ মেয়ের খোঁজে 'লোক' লাগালেন। নিজেও গেলেন সঙ্গে। খুব একটা বেগও পেতে হলো না তাঁকে। খোঁজ পেলেন মামনির, সঙ্গে পলাশকেও। অনেক দূরে, যেখানে একটা ক্লাবের আশ্রয়ে রয়েছে তারা। মেয়েকে ঘরে ফেরানোর জন্য অনেক কাকুতিমিনতি করলেন মিনারুল। কাজ হল না। সঙ্গী এনায়েত সাহেব বললেন, 'মিনারুল, তুমার মেয়ে ভালো মোতো ওয়াশ হইছে। যা বুঝলাম! অরে আর ফিরে পাবা না।' উনি তফাতে সরে গেলেন। 
মিনারুল হাল ছাড়লেন না। পলাশকে স্বধর্মে নিয়ে আসতে মেয়েকে নানাভাবে বোঝানো শুরু করলেন তিনি। কিন্তু তাতেও কোনো ফল দিলো না। শেষে বাড়ি ফিরে এলেন  খালি হাতে। কেননা ক্লাবের সেক্রেটারি আগে থেকেই বলে রেখেছিলেন, 'আপনারা কাউকে জোর করবেন না। ওরা এখন প্রাপ্ত বয়স্ক। ওরা যেটা চায়, আপনাদের সেটা মেনে নিতে হবে। ওরা এখন আমাদের আশ্রয়ে আছে। নাহলে আমরা কিন্তু থানার দ্বারস্থ হবো।'

।।২।।
মামনি-পলাশও সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলেছিল ------দুজনের কেউই ধর্মান্তরিত না হয়ে এক ছাদের তলায় থাকবে। একাজে পাশে পেল ক্লাবকে। দিব্যি দিন কাটাতে লাগলো তারা। কোনো অসুবিধা হল না কারও। ওদের এই সিদ্ধান্তকে শুভকামনা জানিয়ে পাশে থাকার আশ্বাস দিলেন এলাকার বেশ কয়েকজন শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষও। কুর্নিশ জানালেন তাদের সিদ্ধান্তকে। এগিয়ে এলেন এক প্রবীণ নাগরিক। ওদেরকে আশীর্বাদ করে বললেন, 'সাধারণ স্তরেও মানুষের চিন্তা-ভাবনার বদল ঘটছে। শেষ পর্যন্ত যে আমরা সবাই মানুষ, বুঝতে পারছেন কেউ কেউ!'
দিন যায়। মাস যায়। বছর যায়। ইতিমধ্যে মামনির কোল আলো করে এসেছে তিয়াস, ওদের একমাত্র পুত্র সন্তান৷ নানা সুখদুঃখভয়ের মধ্যে দিয়েও মামনি ও পলাশ চাইলো, ছেলেটা মানুষের মতো মানুষ হোক। দেখতে দেখতে সে ছেলে এবার নয়ে পড়েছে।

এদিকে হজে যাওয়ার সুযোগ এসেছে মিনারুলের। হজে যাওয়ার আগে একবার মামনিকে দেখতে ইচ্ছা করছিল তাঁর। সেইমতো বাড়িতে পাড়লেন কথাটা। বিবি রুখসানাও মেয়েকে দেখেননি কতো বছর! তাঁর কৌতূহল, মামনিকে দেখতে এখন কেমন হয়েছে। দুইজনেই কাউকে না জানিয়ে মামনিকে দেখতে যাওয়ার পরিকল্পনা করলেন। সেইমতো প্রায় ১০ বছর পর মামনির আব্বু ও আম্মু পা রাখলেন  'জামাই'-এর বাসাবাড়িতে। অনেক বদল চোখে পড়ল মিনারুলের। মেয়ের চেহারা, পোশাক-আশাক, ব্যবহার এমনকি ঘর-দোর পর্যন্ত। 
পুরনো অশান্তির সব কথা ভুলে থাকলো পলাশ। বাজার থেকে 'শ্বশুর' মশাইয়ের জন্য বড় দেখে একটা কাতলা মাছ আনল সে। খাসির মাংসও আনলো। সে শুনেছে, শাশুড়ি বিরিয়ানি খেতে ভালোবাসে । 
মামনি এখন ভালো বিরিয়ানি রান্না করা শিখে গেছে। সব ঐ ইউটিউব দেখে দেখে। অনেকদিন পর আব্বু, আম্মুকে নিজের হাতে রান্না করে খাওয়াবে মামনি। তাই তার আনন্দ যেন আর ধরে না! সে এখন রান্নাঘরে।

পলাশ এখন একটা মাইক্রোফিন্যান্স কোম্পানির এরিয়া ম্যানেজার। তার কাজের চাপ অনেক। ছুটিতে বাড়িতে থাকলেও কাজ নিয়ে বসতে হয় তাকে। অফিসের কাজ নিয়ে সে বসেছে পাশের ঘরে।
রুখসানা বিবি যাত্রাপথের ধকল সইতে পারেননি। তিনি  ভীষণরকম ক্লান্ত। ঘুমিয়ে আছেন খাটের পরে। এদিকে যোহরের নামাজ শেষ করে বারান্দায় নাতির সঙ্গে 'গল্প' করছেন মিনারুল। গল্পের মাঝখানে হঠাৎ তিনি নাতি তিয়াসকে কোলের কাছে টেনে নিলেন। একথা সেকথার পর তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে মিনারুল বললেন, 'দাদু, মা মরলি, পুড়াইও না কিন্তু, কবর দেও। বুঝলে? আর শোনো, কারুরে যেন কইও না কথাটা।'
কথাটা যেন একটু জোরে বলা হয়ে গিয়েছিল মিনারুলের!  রুখসানা ঘুমাচ্ছেন, তাঁর শোনার কথা নয়। পলাশ পাশের ঘরে কাজে বেশ ব্যস্ত। কিন্তু রান্নাঘর থেকে মামনি কথাটা  শুনতে পেল। 
ধীরে ধীরে সে দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো। আব্বু ঠিক কী বলেছে জানার জন্য ছেলেকে সে বললো, 'কি হয়েছে তিয়াস, কবর নিয়ে কি বললে যেন?'

----- আমি না, দাদুভাই-ই তো বলছিল, তুমি মরে গেলে তোমাকে কবর দিতে। 

মামনি আব্বুর দিকে তাকিয়ে ক্ষণিকের জন্য চুপ করে থাকলো। ঘাবড়ে গিয়ে মাথাটা নিচু করে ফেললেন মিনারুল, মামনির 'আব্বু'।
আড়চোখে একবার মিনারুলকে দেখে নিয়ে মামনি বললো, 'আব্বু, দেহটা আমি দান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পোড়াতেও হবে না, কবরও দিতে হবে না। বুঝলে?'

মামনির কথাটা শোনার পর আবারও মিনারুল মাথাটা নিচু করেই রইলেন। মাথা উঁচু করার সৎ সাহস যে নেই তাঁর! 



-----------------

২টি মন্তব্য:

  1. পলাশকে নিয়ে যে গল্পটি লিখেছেন স্যার মন ছুঁয়ে দেওয়া এক গল্প আমার স্যারকে অনেক অনেক ধন্যবাদ সুজয় স্যার আপনি এভাবে লিখে যান আমাদের জন্য নানান ধরনের গল্প

    উত্তরমুছুন