ঝিনুককে দরজা বন্ধ করতে দেখেই বুকের ভেতরটা ছ্যাক করে উঠলো শুভেন্দুবাবুর। রাগের মাথায় মানুষ কখন যে কি ক'রে বসে!
----- বড়ো বউমা, দরজা খোলো। দরজা খোলো, মা। এমন ছেলেমানুষি ক'রো না।
সজোরে দরজা ধাক্কাতে লাগলেন শুভেন্দুবাবু। দাদুকে ওভাবে দরজা ধাক্কাতে দেখে ভয়ে বড়ো বড়ো চোখ করে তাকিয়ে আছে তপাই। শুভেন্দুর তিন বছরের নাতি। স্পষ্ট করে কথা বলতে পারে না এখনও।
----- মা দলজা খুলতে না কেন দাদান্ ?
----- তুমি একবার ডাকো দাদুভাই, মা ঠিক দরজা খুলবে।
ছোট্ট দুটো হাত দিয়ে দরজায় ধাক্কা দিতে লাগলো তপাই।
----- মা, দলজা খোলো। মা, দলজা খোলো।
মা দরজা খুলছে না দেখে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো সে।
দু'হাত দূরেই সোফায় বসে আছে কমল। না শোনার ভান করে মোবাইলে গেম খেলে চলেছে। নাতিকে কোলে তোলার বৃথা চেষ্টা করে যাচ্ছেন শুভেন্দু। তার কান্না থামছে না কিছুতেই।
দরজা ভেজানোই ছিল। মুদির বাজার করে ঘরে ঢুকলো সবিতা। কাজের মেয়ে। তপাইকে ওভাবে কাঁদতে দেখে একপ্রকার জোর করেই কোলে তুলে নিল তাকে। কিন্তু থামলো তো না-ই, তপাইয়ের কান্না দ্বিগুণ গেল বেড়ে।
ওদিকে ঘর বন্ধ করে ঝিনুক সমানে বালিশে মুখ গুঁজে শুধু কেঁদে চলেছে। শেষে কি না গায়ে হাত দিলো কমল! কি হবে এই তাচ্ছিল্যের জীবনটা রেখে! জীবনটা শেষ করে দিতে হাতের কাছে সবকিছুই মজুত। বদ্ধ ঘরে কেউ বাধাও দেবে না! কিন্তু দরজার বাইরে শুধু তার জন্যই এক নাগারে কেঁদে চলেছে তপাই ----- তারই রক্ত, মাংস, দিয়ে গড়া এক অবোধ শিশু। সে চলে গেলে তপাইকে কোলেপিঠে করে কে মানুষ করবে ? নাড়ি ছিন্ন করে তাকে যে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছিল সে-ই। দায় তো তাই তারই! কেননা এক অকালকুষ্মাণ্ড যদি হয় তার জন্মদাতা পিতা, তার তো প্রতি পদে পদে বিপদ! হঠাৎ ডেসিন টেবিলের আয়নায় চোখ পড়লো ঝিনুকের। আয়নার ঝিনুক যেন তাকে বলছে, ' দরজা খোলো ঝিনুক। তপাই কাঁদছে।'
দরজা খুললো ঝিনুক। তপাইকে সবিতার কোল থেকে নিজের কোলে নিয়ে নি:শব্দে কেঁদে ফেললো সে। শুভেন্দুবাবু তার পিঠে হাত রাখলেন।
বসার ঘরে সোফার উপরে মাথা নিচু করে তখনও বসে আছে কমল। হাতে মোবাইল। ঝিনুককে বেরোতে দেখে একবার তাকালোও। শুভেন্দুবাবু কমলের দিকে তাকিয়ে বিরক্তির সঙ্গে বললেন, ' ছি! বড়ো খোকা, ছি! তোকে যে কি বলবো, ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না!'
ঘাড় নাড়তে নাড়তে তিনি নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন। মাথা তুলে বাবার চলে যাওয়ার দিকে তাকালো কমল। তারপর বাইকের চাবিটা নিয়ে সোজা বাইরে বেরিয়ে গেল সে।
এই গম্ভীর পরিবেশে সবিতা রান্না ঘরে যাওয়ার সাহসও পাচ্ছে না। এদিকে বেলা বয়ে যাচ্ছে।
ঝিনুক এখন চোখের জল মুছে তপাইকে স্নান করানোর তোরজোড় করছে। মুখে কোনও কথা নেই তার। আজ দিনটা অন্যরকম। দিন পনেরো আগেই সেটা হতে পারতো। ঝিনুক তা চায়নি। সময়। সময় দিয়েছিল কমলকে। যাতে আর কোনও দিনই সে বর্ণালীর ছায়া না মাড়ায়। গত রাতেও তো এই নিয়ে একচোট হয়ে গিয়েছে। আর আজ সকালে বর্ণালীর ফোনটা আসার পরেই এই গণ্ডগোল।
(২)
----- কে এই বর্ণালী, রজতদা?
সম্পর্ক উর্বর হলে পরও কখন আপন হয়ে যায়। রজতকে দাদা বলেই ডাকে ঝিনুক। রজত কমলের কলিগ। নিজের বোনের মতো ভালোবাসে ঝিনুককে।
----- বর্ণালী আমাদের সেকশনে নতুন জয়েন করেছে। মেয়েটি এমনি মিশুকে। আনম্যারেড। বাবার একটাই মেয়ে। বাড়ির অবস্থা ভালো।
----- কিন্তু কিভাবে ব্যাপারটা....
----- ওরা প্রায়ই অফিস শেষে একসঙ্গে ঘুরতে বেরোয়, এরকম কানাঘুষো শুনেছি। তবে সেদিন যেটা ঘটেছে... আর বসে থাকতে পারলাম না, তাই ছুটে এলাম।
----- কি এমন ঘটলো রজতদা...
----- আমাদের স্টাফ পুলককে তো তুমি চেনো?
---- হ্যাঁ, একবার দেখেওছি রাতুল চৌধুরীর মেয়ের বিয়েতে।
----- সেদিন প্রায় সবাই-ই ছুটির পর অফিস থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলাম। ছিল শুধু কমল, বর্ণালী, গ্রুপ ডি স্টাফ দুজন আর পুলক। পুলকের মুখের কথায় আমি বিশ্বাস করিনি। যখন মোবাইলে সেই ছবি দেখালো, আমি আকাশ থেকে পড়লাম! কমল কি না বর্ণালীর কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে, আর বর্ণালী বিলি কাটছে মাথায়!.... জানি তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে শুনতে। কিন্তু মনে হল তোমাকে ঘটনাটা জানানো দরকার। এখনও সময় আছে, কমলকে ও পথ থেকে সরাও।
রাতে খাওয়াদাওয়া হয়ে গেলে যে দুয়েকটা কথা হয়েছিল ঝিনুক আর কমলের মধ্যে, তা এইরকম :
---- বর্ণালী কে?
---- রজত এসেছিলো?
---- আমার প্রশ্নের উত্তর পাইনি।
---- ঐ তো বললাম। রজত এসেছিলো নিশ্চয়! ঐ-ই তো সব বলে গেছে। আবার আমাকে জিজ্ঞাসা কেন, বর্ণালী কে?
---- ওর সঙ্গে তোমার কী সম্পর্ক?
---- আর পাঁচটা কলিগের সঙ্গে যেমন...
---- বাজে কথা রাখো। আমি কি বলতে চাইছি, আশাকরি বুঝতে পারছো?
---- কী বলতে চাইছো?
---- স্বাদ বদল করছো?
---- আমার ঘুম পাচ্ছে। এই রাত দুপুরে চেল্লামেল্লি করতে ভালো লাগছে না।
---- তাই! আচ্ছা, আমাদের কি প্রেম করে বিয়ে হয়েছিলো?
---- আঃ, একটু ঘুমোতে দেবে?
---- ঘুম? আমার ঘুম কেড়ে নিয়ে তুমি ঘুমোবে?
---- চিল্লিও না। পাশের ঘরে বাবা আছে। তপাই জেগে উঠবে।
---- বাঃ, কতো ভাবো তুমি! কতো ভাবো! এই ভাবনাটাই আগে হয়নি কেন? আমার কথা ভেবেছিলে? ভাবোনি।.... যাক, একটা কথা বলে রাখলাম, দ্বিতীয়বার যেন বর্ণালীকে নিয়ে তোমার নামে কোনও কথা না শুনি।
(৩)
সেই রাতের পর থেকে বর্ণালীর কোনও নামগন্ধ শোনা যায়নি কমলদের বাড়িতে। অনেকদিন। কিন্তু আজ সকালে একটা আননোন নম্বর থেকে ফোন এসেছিলো কমলের মোবাইলে। কমল তখন টয়লেটে।
---- হ্যালো কে?
---- আমি বর্ণালী বলছি। কমলদা নেই?
---- বর্ণালী? না, এটা রঙ নম্বর। ফোনটা কেটে দিয়েছিলো ঝিনুক। এর ঠিক পাঁচ মিনিট পরে আবার ফোন এসেছিলো। সেম নম্বর। ফোনটা ধরে চুপ করেছিলো ঝিনুক।
---- হ্যালো, ফোনটা কাটছেন কেন, এটা কমলদারই নম্বর।
---- হ্যাঁ, কমলদার নম্বর। কি দরকার বলো।
---- সেটা কমলদাকেই বলবো।
মাথাটা হঠাৎ গরম হয়ে গিয়েছিল ঝিনুকের। আর সামলাতে পারেনি।
---- বেহায়া কোথাকার! আর কোনও দিনও যদি তুমি এই নম্বরে ফোন করেছো...ফোনটা কেটে দেয় ঝিনুক।
এরমধ্যেই কখন যে কমল তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে, তা টের পায়নি সে। ঝিনুকের হাত থেকে মোবাইলটা এক প্রকার ছিনিয়ে নিয়ে একটা চড় কষিয়ে দিলো কমল। এই প্রথম। দশ বছরের বিবাহিত জীবনে এই প্রথম ঝিনুকের গায়ে হাত তুললো কমল।
(৪)
তপাইকে স্নান করানো হয়ে গেছে। ও এখন ব্যালকনিতে দাদুর সঙ্গে গল্প জুড়েছে। সবিতা রান্নাঘরে। সবকিছু আন্দাজ করে ঝিনুককে আর ঘাটায়নি সে। ঝিনুক এখন বেডরুমে ঠাইঁ বসে।
এ ঘটনা কার সঙ্গে শেয়ার করবে ঝিনুক? মা'র সঙ্গে? মা'র বয়স হয়েছে। চিন্তা করবে। তবে কাকে বলা যায়, যাতে একটু হলেও হাল্কা হতে পারে ঝিনুক। কেয়াকে কি ফোন করা যায়! ও তো ঝিনুকের পুতুল-বেলার বন্ধু। ও তো বুঝবে ওর ব্যাপারটা। স্কুলে থাকতে কতো কথা তো শেয়ার করেছে কেয়াকে!
অনেকদিন ফোনাফোনি হয়নি দুজনের। নম্বরটা ডায়াল করতেই সেই চিকন গলা, বাব্বা, তুই তো একদম ভুলেই গেছিস!
----- ভুললে কি আর ফোন করতাম?
---- যাক্, কেমন আছিস বল্।
---- তুই কেমন আছিস বল্।
ঝিনুকের কথার উত্তরে এক মুহূর্ত না থেমে কেয়া বললো, বিন্দাস! খাচ্ছি দাচ্ছি, ঘুরে বেরাচ্ছি, বরের পকেট কাটছি আর বাচ্চা সামলাচ্ছি।
----বাঃ, খুব ভালো! বরের পকেটও কাটছিস?
---- কি করবো বল, বড্ড হিসাবি। আমি অতোটা পারি না। যাক্, এবার তোর কথা বল্।
একটু হেসেই ফেললো ঝিনুক। সে হাসিতে কি ছিল না বুঝলেও, হাসির শেষে যে দীর্ঘশ্বাস নিল ঝিনুক, তা টের পেল কেয়া।
---- ভালোই তো ছিলাম...কিন্তু ইদানীং কেমন যেন সব এলোমেলো হয়ে গেল!
---- কেন, কি হল? শুনেছি তো শাশুড়ি নেই। ননদও নেই...
---- মিনষে তো আছে।
হেসে ফেললো কেয়া।
---- কি বললি, 'মিনষে'? তা তোর 'মিনষে' আবার কি করলো?
---- প্রেম।... উনি আবার প্রেমে পড়েছেন।
---- ধ্যাত, কমলদা! এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে।
---- হলেও বলি, এটাই ঠিক। আর তারপর...
---- তারপর কী?
---- না, থাক।
---- আপত্তি থাকলে বলিস না।
---- না, তা ঠিক না। কি আর বলবো বল্, শেষটাই গায়েও হাত তুললো কমল!
---- এমা, তাই!
---- হ্যাঁ। আজ।
বিস্তারিত জানার পর কেয়া সহানুভূতির সুরে বললো, 'আরে, তাতে তুই এত আপসেট হয়ে পড়ছিস কেন বলতো! একটা 'টি-টোয়েন্টি' তুইও খেল না!'
---- মানে?
---- মানে আবার কি, এখন দিনকাল অনেক বদলে গেছে। সব জেনেশুনেও কাছুমাছু হয়ে ঘরের কোনায় বসে থেকে আসন সেলাইয়ের দিন নেই আর। ওকেও বুঝতে দে না কতটা কষ্ট তুই পেয়েছিস। একা একা কেন গুমড়ে মরবি! তোরও তো একটা জীবন আছে। পছন্দ-অপছন্দ, ভালোলাগা -মন্দলাগা আছে!
---- কী বলতে চাইছিস ?
---- বলছি, একটা বন্ধু খোঁজ ঝিনুক। দেখবি, তোর পরিচিত গণ্ডির মধ্যেই কাউকে পেয়ে যাবি; যে তোর অনুভূতিগুলো বুঝতে পারবে।
---- ইয়ার্কি মারিস না কেয়া।
---- আমি ইয়ার্কি মারছি না রে। সত্যি বলছি, এখন একজন বন্ধুর খুব দরকার তোর। যে তোর কথা ভাবে না, তুই-ই বা তার কথা ভেবে ভেবে কষ্ট পাবি কেন! তাছাড়া তুই উচ্চ শিক্ষিত, একটা কাজ ঠিক জোগাড় করে নিতে পারবি, দেখবি।.... তবে তপাই ছেলে মানুষ। ওকে কষ্টটা বুঝতে দিস না।'
---- এসব কোনও দিন স্বপ্নেও ভাবিনি কেয়া। এসব স্কুল-কলেজ লাইফে হলে বলতে পারতিস। এখন আমরা সংসারী। এসব ভাবাও তো পাপ!
---- পাপ? সংসার কি তোর একার না কি? সে তো এসব কিছু ভাবছে না!.... শোন, তুই ভালো থাকলে বন্ধু হিসেবে আমারও ভালো লাগবে। তাই বলা.... এই রে!
---- কি হল?
---- আর বলিস না, আমার ছোটছেলেটাতো এখন একা একাই পায়খানায় বসতে শিখে গেছে। কিন্তু পটি করার পর জলটা সেই আমাকেই ঢেলে দিতে হয়। পটি করে দাঁড়িয়ে আছে। ডাকছে। ভালো থাকিস, বুঝলি। পরে ফোন করবো।
মোবাইলটা খাটের ওপর রেখে চুপ করে বসে থাকলো ঝিনুক। অনেকক্ষণ। ভাবছিল কেয়ার কথাগুলো। এটা ঠিক, কমলের সঙ্গে তার সম্পর্কটা আর আগের মতো নেই। জানে কমলও। এভাবে সম্পর্ক টেকে না। সত্যিই তো, সংসার তার একার নয়, কমলেরও। কি হবে এই মিথ্যে সম্পর্কটা আগলে রেখে! লোক দেখানো 'বরবউ' সেজে!
ঝিনুক ভাবছিল তপাইয়ের কথাও। যদি সত্যিই একদিন তপাইকে সঙ্গে করে বেরিয়ে যেতে হয় এই সংসার থেকে, কিভাবে নেবে ও ব্যাপারটাকে? প্রথম প্রথম খুব কষ্ট পাবে নিশ্চয়। তারপর ধীরে ধীরে সব সয়ে যাবে।
---- বউমা, দাদুভাইকে খাইয়ে দাও। ওর পেটে কিছু নেই।
পেছন ঘুরে ঝিনুক দেখলো বাবা দাঁড়িয়ে। শুধু তো তপাই নয়, এই লোকটির কথাও তো তার ভাবা দরকার। বয়স হয়েছে তারঁ। হার্টের পেশেন্ট। তপাইকে তারঁ কোল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেলে, তিনি কি করে বাঁচবেন? তিনি তো একা!
---- ও, বউমা, আজ কমল এলে আমি একবার তোমাদের সঙ্গে বসবো, বুঝলে!
ঝিনুককে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই শুভেন্দুবাবু ধীরে ধীরে তারঁ শোওয়ার ঘরের দিকে পা বাড়ালেন।
শ্বশুর মশাইয়ের চলে যাওয়ার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ঝিনুক। ঋজুদেহ মানুষটাকে আজ কেমন ঝুঁকে চলতে দেখলো সে!
--------
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন