মঙ্গলবার, ২৯ জুলাই, ২০২৫

সুজয় চক্রবর্তীর গল্প : অসুখ



'ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম তখন, বুঝলে, ভুল।' গতকাল আমাকে এই কথা বলেছে রত্না। আজ সাত বছর পর।

রত্নাকে আমি সেই ছোটবেলা থেকেই চিনতাম। ও তখন ফ্রক পড়তো। তারপর তো চুড়িদার, শাড়ি। বলা যায়, রত্না আমার সামনেই যুবতী হল ! ও যখন ক্লাস সিক্স , আমি তখন এগারো ক্লাসের আর্টসের ছাত্র। ও যখন বাংলায় অনার্স নিল, আমি তখন চুটিয়ে টিউশনি করছি। একই পাড়াতে থাকতাম। দুতরফেই যাওয়া-আসা ছিল। 'দাদা' বলে ডাকতো।

শুধু আমার না, বয়সে আমার বোনের চেয়েও ছোট রত্না। বোন এম.এ পাশ করলো যে বছর, রত্না তখন সেকেন্ড ইয়ার, বাংলা অনার্স।  কিন্তু সে যে আমাকে নিয়ে 'অন্য' কিছু ভেবে ফেলেছিল, তা জানতাম না। পড়ার ফাঁকে ফাঁকে ফুলস্কেপ কাগজে প্রায় চার পাতার এক চিঠি লিখেছিল, আমাকে দেবে বলে। চিঠিটা পাঠিয়েছিল নিবেদিতাকে দিয়ে। নিবেদিতা আমার বোন। কাকুর মেয়ে। চিঠিটা পড়ার পর আমি তো রীতিমতো অবাক ! মেয়েটা বলে কি ! এতোটা ভালোবাসে আমাকে !

ঠিক করলাম, ওর সঙ্গে কথা বলা দরকার। সামনাসামনি কথা বললে লজ্জা পেতে পারে ভেবে ওকে ফোনে ধরলাম। বললাম, 'রত্না, টিউশনি আজ আছে, কাল নেই। আমি একপ্রকার বেকারই বলা চলে। আগে নিজের পায়ে দাঁড়াই, তারপর এ নিয়ে ভাববো। তাছাড়া বেকার ছেলের হাতে তোমার মা-বাবা কি তোমাকে তুলে দেবেন ? '

একটু এগিয়ে ভেবে ফেলেছিল রত্না।  জবাবে বলেছিল, ' টিটুদা, দুজনে মিলে একটা সংসার টেনে নিয়ে যেতে পারবো না ! আর বাড়ির ব্যাপারটা আমার ওপরেই ছেড়ে দিতে পারো। তুমি রাজি কিনা তাই  বলো? '

আমি এ প্রান্তে কি বলবো তখন ভেবে পাচ্ছি না। এ জাতীয় ঘটনা যে কোনও দিন আমার জীবনে  ঘটবে, ভাবিনি। চুপ মেরে রয়েছি দেখে রত্নাই মুখ খুললো, ' আপত্তি থাকলে ব'লো। যদি তোমাকে নাও পাই, আমার কোনও আপশোস থাকবে না, টিটুদা। ভেতরের কথাটা যে তোমাকে জানাতে পেরেছি, সেই যথেষ্ট।'

একদম ঠিক । কম মেয়েই সেটা  পারে। ওর এই স্পিরিটটা বরাবরই ঈর্শনীয়। এতটুকু ভনিতা নেই। ছেলেরা যদি 'আই লাভ ইউ' বলতে পারে, মেয়েরা কেন পারবে না ! তাদেরও তো পছন্দ-অপছন্দ আছে ! ভালো লাগা, মন্দ লাগা আছে ! আর কেন জানি না, ওর এই জিনিসটাই হঠাৎ আমারও ভালো লেগে গেল ! তাছাড়া অপছন্দ হওয়ার মতো দেখতে ও ছিল না। তাই শুধু ও না, আমিও ওর প্রেমে পড়ে গেলাম । দৃষ্টি ভঙ্গির পরিবর্তন করলাম সেদিন থেকেই। ইতিমধ্যে আমার ভেতরেও যে একটা ঝড় বইতে শুরু করেছে, টের পাচ্ছিলাম।

রত্না ওর বাড়িতে বরাবরই স্বাধীনতা পেয়ে এসেছে। তাই কোনও অসুবিধা হল না ওর। সবাইকে দিব্যি ম্যানেজ করে নিল। বেগ পেতে হল আমাকে। যথেষ্টই । রত্নার চার পাতার চিঠির কথা আমার বাড়ির কেউ জানতে বাকি থাকলো না। পরিবারের সদস্য হয়েও আমি যেন তখন পড়শী বাড়ির ছেলে ! সবাই একদিকে আর আমি আরেক দিকে। বাড়ির মতে, এমন 'নির্লজ্জ' মেয়েকে কিছুতেই ঘরের বউ করা যায় না। এই যদি কালচার হয়, তো সংসার দুদিনেও টিকবে না৷ আমার তখন গলায় আঙুল দিয়ে বমি করার মতো অবস্থা।

এরমধ্যেই কাকতালীয়ভাবে চাকরিটা পেয়ে গেলাম। বন্ধু সঞ্জীবের আনুকূল্যে। প্রাইভেট কোম্পানি। কিন্তু ধীরে ধীরে বেতন বাড়বে। খবরটা জেনে রত্না আর দেরি করতে চাইলো না। আমিও আর অন্য কিছু ভাবিনি। চাকরিতে জয়েন করেই ওর ভালোবাসার দাম দিলাম ওকে বিয়ে করে। বাড়ির অমতেই।

আজ সেই বিয়ের সাত বছর পূর্ণ হল। পাক্কা সাত বছর। মনে আছে, ছোয়াছুয়ির আড়ষ্টতা প্রথম দিনই ভেঙে দিয়ে আমার হাতে হাত রেখে রত্না বলেছিল, 'দেখবে আমরা ঠিক চালিয়ে নিতে পারবো, টিটুদা। কোনও অসুবিধা হবে না।'

বিয়ের পর বাড়ি ছেড়ে চলে এলাম শ্রদ্ধানন্দ পার্কের ভাড়া বাড়িতে। তারপর তো পুরোদস্তুর সংসারী হয়ে উঠলাম। একটা সময় টিভি, ফ্রিজ, ওয়াসিং মেসিন সবই কিনে ফেললাম ইন্সটলমেন্টে। এখনও শোধ করছি সেসব। টুনাটুনির সংসারে হাসি, আনন্দে দিব্যি চলে যেতে লাগলো দিনগুলো ।

বিয়ের বছর দুয়েকের মাথায় রত্নার কোল আলো করে এলো গুবলু ৷ আমাদের একমাত্র ছেলে। আজ তার পাঁচ বছর হল। রত্না আর বাচ্চাকাচ্চা চায় না। একটাকেই ও মানুষের মতো মানুষ করে তুলতে চায়। আমারও তাতে সায় আছে । মাসে যা হাতে পাই তাতে মোটামুটিভাবে সংসারটা চলে যায় । ও বলেছিল, 'জব' করবে। আমিই বাধ সেধেছি। না খেয়ে তো আর নেই !

এতদিন সত্যিই কোনও অসুবিধা  হয়নি। ঠিক চালিয়ে নিচ্ছিলাম। কিন্তু এখন টের পাচ্ছি । একটা সংকট প্রকট হয়ে উঠছে ক্রমশ। ব্যাপারটা যে আর্থিক, বলাইবাহুল্য।  আমাদের এই পাড়াটাতে গুবলুর বয়সী প্রায় সব বাচ্চাই ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে। গাড়ি এসে বাড়ির দোরগোড়া থেকে ওদের নিয়ে যায়। স্কুল বাস। রত্নারও ইচ্ছে গুবলু ঐ বাসে করে স্কুলে যাবে। অর্থাৎ ছেলেকে সেও ইংলিশ মিডিয়ামে পড়াবে ঠিক করেছে। এই সেশনেই। কিন্তু সেসব প্রথমে আমাকে বলেনি। যখন ভর্তির ফর্ম নিয়ে এলো বাড়িতে, তখন জানতে পারলাম। বললাম, 'রত্না, এটা আমাকে বলতে পারতে। ছেলেটাতো আমারও নাকি! '

আমি যে অখুশি, তা বুঝতে পেরে রত্না বললো, 'আরে, তোমাকে বলবো বলবো করেও সময় হয়ে ওঠেনি। তাছাড়া তুমি বাড়ি থাকো কতক্ষণ?'  

------ সে না হয় দিনের বেলা। রাতের দিকে তো বাড়িই থাকি ! 

------ আচ্ছা বাবা, ভুল হয়েছে। এবার ছাড়ো।

বোঝালাম অনেক। 'রত্না, ওখানে দিলে ছেলে না বাংলা, না ইংরেজি কোনওটাই ভালো করে শিখবে না। তারচেয়ে বাংলা মিডিয়ামেই থাক না! সিক্স-সেভেন পর্যন্ত আমরাই ওকে পড়াতে পারবো। টিউটর লাগবে না। তাছাড়া আমরাও তো বাংলা মিডিয়ামেই পড়েছি! '

---- হুঁ, জানতাম এটাই বলবে। তোমার জ্ঞানের কথা রাখো। আজ পর্যন্ত আমার কোন শখ-আহ্লাদটা তুমি পূরণ করেছো, বলতে পারো?  ছেলেটাকে যে একটা ভালো স্কুলে পড়াবো, তাতেও তোমার আপত্তি! পকেটের জোর তোমার কোনও কালেও হবে না।


আমি সহজে রাগী না। রাগলে দেখেছি, তাতে ফল ভালো দেয় না। তাই ঠান্ডা মাথায় ওকে বললাম, 'রত্না, আমাদের স্ট্যাটাস আর ওদের স্ট্যাটাস এক না। একটা প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করে একজন কতো কি করতে পারে, বলো তো? '

---- তাই বলে ছেলের ভবিষ্যতের কথা ভাববো না!

----- অবশ্যই ভাববে। কিন্তু সাধ আর সাধ্যের ফারাকটাও তো বুঝবে।

 ---- আমার অতো ফারাক বুঝে কাজ নেই। এতো দিন অনেক বুঝেছি। জীবনে তো কোনও শখ-আহ্লাদই মিটলো না!

আমি আর কথা বাড়ায়নি। চুপ করে গেলাম। একসময় রত্নাও দেখি চুপ মেরে গেল। ঘটনার পর টানা দুদিন রত্না আমার সঙ্গে কোনও কথা বললো না।


তারপর পরিবেশ যখন একটু শান্ত হল, একপ্রকার জোর করেই গুবলুকে আমাদের পাড়ার প্রাইমারী স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিলাম । বাস-টাসের ব্যাপার নেই। পিঠে ব্যাগ নিয়ে পায়ে হেঁটেই হেলতেদুলতে স্কুলে যায় গুবলু। ওকে পেছন থেকে দেখলে আমার ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যায়। কখনও রত্না, কখনও আমি ওকে স্কুলে দিয়ে আসি। রত্না এনিয়ে আর কিছু বলেনি।


কিন্তু ইদানিং খেয়াল করছি চারদেয়ালের মাঝে থাকলেও আমার সঙ্গে রত্না আর আগের মতো হেসে কথা বলে না । দুটো সুখ-দুখের গল্পও করে না! আমি বলতে গেলে এতটা উদাসীনভাবে থাকে যে, বাধ্য হয়ে আমাকে ঢোক গিলতে হয়। এমনকি দৈবাৎ ঘটে যাওয়া রাতের বিছানাতেও রত্না আগের মতো ঘোলাটে চাউনি নিয়ে আমার দিকে তাকায় না আর । গলদটা যে ঠিক কোথায়, ধরতে পারলেও কিছুই করার নেই আমার ।


ঘরে বউ-ছেলে নিয়ে থাকলেও মাঝেমধ্যেই আমার মনে হয় , আমি কি জীবনে আদৌ সুখী হতে পারলাম? এরকম কেন মনে হয়, বলে বোঝাতে পারবো না। কিন্তু হয়। সুখ নাকি স্বপ্নে ! কিন্তু মাঝেমাঝে যা স্বপ্ন দেখি তাতেও সুখী হওয়ার কোনও কারণ খুঁজে পাইনি। মরার মতো শুয়ে থাকি বিছানায়। ঘুম নেই চোখে । প্রায় রোজই এরমটা হয়। পাশের ঘরে রত্না আর গুবলু শুয়ে থাকে। ইচ্ছে হয় ওদের পাশে গিয়ে শুয়ে পড়ি। কিন্তু পা বাড়াতে গিয়েও ভেতর থেকে কেমন যেন গুটিয়ে ফেলি নিজেকে।


আজ বাড়ি ফেরার পথে কি মনে হল হারুদার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে গেলাম। প্রায় পনেরো-ষোল বছর পর। চৌধুরী সুপার মার্কেটের পাশের ফুটপাতে হারুদা পুরনো বইপত্র নিয়ে বসে । অনেক দিন ধরে। সেখানে রান্নার বই থেকে শুরু করে স্পোকেন ইংলিশ, কামসূত্র, জোকস, নানা ধরনের বই রাখে । হারুদার সঙ্গে আমার আলাপ বহুদিন আগে । বই পড়ার সূত্রেই । যখন নাকের নিচে গোঁফের রেখা দেখা দিচ্ছে তখন থেকে। হারুদাকে পঞ্চাশ পয়সা দিলে হারুদা 'চাচা চৌধুরীর' বই পড়তে দিত সাতদিন ধরে । সাতদিন লাগতো না। একদিনেই শেষ করে আবার অন্য বইয়ের জন্য ছুটতাম হারুদার কাছে । হারুদা মুচকি হেসে পাতিয়ে রাখা পলিথিনের উপর থেকে আমার পছন্দের বইটি তুলে দিত হাতে ৷ এখনও হারুদা তেমনই আছে, শুধু বয়স বেড়েছে এই যা। 

 আজ দেখলাম ত্রিপলের উপরে নানান স্বাদের বই সাজানো। মাথা নিচু করে সেগুলো দেখছিলাম। হঠাৎ একটা বইয়ের দিকে চোখটা আটকে গেল ৷ মনে হল, এই বইটাই আমার দরকার। ভীষন রকম দরকার। কারণ বইটার নাম, ‘ বিবাহিত জীবনে সুখী হওয়ার উপায়।'


বইটা হাতে নিয়ে পাতা ওল্টাতে গিয়ে দেখলাম বড়ো বড়ো হরফে রিভার্স করে লেখা ---‘ কী করবেন, কী করবেন না ।‘ স্বামী-স্ত্রীকে লক্ষ্য করে কিছু টিপস দেওয়া আছে। যেমন : ছোটখাটো ব্যাপারেও মনোযোগ দিন , ঘ্যানর ঘ্যানর করবেন না , সঙ্গী বা সঙ্গীনীকে অধিকার করতে চাইবেন না , কাজের শেষে তাকে আন্তরিক প্রশংসা করুন ইত্যাদি ইত্যাদি ।

---- হারুদা, বইটার দাম কতো গো ?

---- দশ টাকা ।

টাকাটা দিয়ে বইটা অফিস ব্যাগে রাখতে যাবো , অমনি চোখ পড়লো উলটো দিকের ফুটপাতে ।

দুটো পিঠোপিঠি বাচ্চা খেলা করছে। খালি গা । দুটোই ছেলে হবে বোধহয়। পাশেই উনুনে ভাত চাপিয়েছে তাদের মা । বাবাটা একটা ইটের উপর বসে বিড়ি টানছে আর মা’র সঙ্গে গল্প করছে । ঝুপড়ি ঘরটার পাশে একটা রংচটা রিক্সা দাঁড় করানো। গল্প বলার ফাঁকে ফাঁকে শিমের বিচির মতো দাঁত বার করে বাবাটা হেসে উঠছে ৷ মা-ও ফিক করে হেসে আঁচল দিয়ে মুখ চাপা দিচ্ছে। মাঝেমাঝেই। ল্যাম্পপোষ্টের আবছা আলোতেও ওদের মুখগুলো বড় উজ্জ্বল দেখাচ্ছে ! 

মাথায় ছাদ নেই। গায়ে জামা নেই। পেটে খিদে নিয়েও দিব্যি 'সুখে' আছে মনে হল ওরা । হাতে ধরা বইটার দিকে চোখ পড়তেই ভাবলাম, বাবা লোকটা কি হারুদার এই বইটা পড়েছে? কি জানি । হয়তো পড়েও থাকতে পারে।

হারুদার দোকান ছেড়ে এখনও যাইনি। আঙুল দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলাম হারুদাকে, ' ঐ লোকটা কি তোমার দোকানে বইটই পড়তে আসে? '

---- ও? ও তো নবীন। লেখাপড়াই জানে না ! আঙুলে টিপছাপ দেয়। ও আবার কী পড়বে?

কথাটা শোনার পর আমি আর কথা বাড়ালাম না। শুধু বইটা পালটে একই দামের 'এসো টেন্স শিখি ' বইটা ব্যাগে পুরে বাড়ির দিকে পা বাড়ালাম। ওটা গুবলুর কাজে লাগবে।

ভাবছি, এখানে একবার রত্নাকেও আসা দরকার। 




                   --------------------------------------------------



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন