বশীকরণে কেষ্টদা
সুজয় চক্রবর্তী
কেষ্টদা 'কলির কেষ্ট' নাহলেও নামের সৎ ব্যবহার করেছে। একবার না, বেশ কয়েকবার। সেসব আমরা জানতাম না। জগাদা জানতো। জগাদার চায়ের দোকানই ছিল তখন কেষ্টদাদের সমস্ত কাজ-কম্মের শলাপরামর্শের কেন্দ্রস্থল। কেষ্টদার বউ বনিবৌদি কেষ্টদার বিয়ে করা একমাত্র বউ। জগাদা সেদিন গল্পচ্ছলে যা বললো, আমরা তো অবাক!
বছর তিনেক মৌবনীর পিছনে মৌমাছির মতো ঘুর ঘুর করে 'মধু' সংগ্রহ করার পর কেষ্টদার নাকি হঠাৎ মনে হল, নাহ! এবার একটু স্বাদ বদল করা যাক। তারপর থেকেই নানা অজুহাত দেখিয়ে মৌবনীর থেকে শতহাত দূরে থাকার চেষ্টা শুরু করলো কেষ্টদা। ব্যাপারটা ধূর্ত শিয়ালের মতোই খেয়াল হল মৌবনীর। অন্য ঘাটে কেষ্ট যতই ছিপ ফেলুক, ট্রিগারে সে টিপ দিয়েই আছে, হয় কেষ্টকে প্রাপ্তি নয় কেষ্ট'র পঞ্চত্বপ্রাপ্তি।
বাতাসেরও কান আছে। খবরটা শুনে পাড়ার পূরবী মাসি রবির আলো ফোটার আগেই হাজির মৌবনীদের বাড়িতে। পূরবী মৌবনীকে মেয়ের মতোই ভালবাসে। সাতঘাটে জল খাওয়া মহিলা। কেষ্ট যে ঘাটেই ছিপ ফেলুক, মাছ আর ডাঙায় উঠবে না।
মাসির ডাক শুনে চোখ কচলাতে কচলাতে বাইরে এলো মৌ। মাসি বললো, মৌবনী মা, বনিবনা হচ্ছে না শুনলাম! তুই এক কাজ কর, বশীকরণ কর। সব ঠিক হয়ে যাবে। এই বলেই হাতের মুঠোয় গুটো করা কাগজটা সে বাড়িয়ে ধরলো মৌবনীর চোখের সামনে। জ্যোতিষীদের বিজ্ঞাপনে ভরা পুরো পাতাটা। চোখ চিক্ চিক্ করে উঠলো মৌবনীর। বেশ নরম রোদের চাউনি খেলে গেল চোখেমুখে। তারপর মুখ খুললো মৌ, ' মাসি, এবার কেষ্টকে বশ করে আমিই ওর বস্ হয়ে বসবো, দেখো। ' মাসি সায় দিলো, ' তা-ই তো চাচ্ছি। ঐজন্যই তো আসা!'
আবেগে সেদিন রাতে পদ্যও লিখে ফেললো মৌবনী, ----- এই ছিল তোর মনে? / ভুলে গেছিস সেঁধিয়ে ছিলি / আমারই নিধুবনে!
গতকালের মাসির দেওয়া খবরের কাগজটাতেই চোখ বোলাচ্ছিলো মৌ। দীননাথ শাস্ত্রী। পাঁচ মিনিটে বশীকরণ। লিখিত গ্যারান্টি। রঘু মহারাজ। তিন মিনিটে বশীকরণ। ইনি লিখিত গ্যারান্টি দেন না, তবে বিফলে মূল্য ফেরৎ। একজন ঝাউডাঙা, অন্যজন চাঁদিপুর। মৌবনী ভাবতে বসলো, কার কাছে যাওয়া যায়! যাওয়াটাই বড়ো কথা। কাজটা তো অল্প সময়েই হয়ে যাবে। এদিকে সময়ও কম। এরমধ্যেই নিশ্চয় কেষ্ট'র বঁড়শিতে টান পড়তে শুরু করেছে। এক মিনিট সময়ও তার কাছে মূল্যবান। বশ যদি করতেই হয়, এখনই করতে হবে। নইলে সারা জীবন পস্তাতে হবে। তর স'ল না তার। পা ফেললো রাস্তায়।
জগাদার চায়ের দোকানে তখন 'নব্য মৎস্য উপাখ্যান' বন্ধুদের পাঁচকান করতে ব্যস্ত কেষ্টদা। হাজির মৌবনী। মৌবনীকে দেখার পর এক নম্বর সিন ----- কেষ্টদা বেশ উদাসীন। দু'নম্বর সিন ----- মৌবনীর কাছে 'সিন ক্রিয়েট' করতে লাগলো কেষ্টদা, ' দেখো মৌ, আমি তো বেকার। তাছাড়া আমাদের সম্পর্কটা আমার বাড়ি থেকে কিছুতেই মেনে নিতে চাইছে না। তাই.....
কথাটা শেষ হল না, মৌবনীর নরম হাতের চড় গিয়ে পড়লো কেষ্টদার গালে। এক গালে চড় মারলে বিয়ে হয় না, তা হয়তো জানা ছিল তার। তাই কেষ্টদার দু'গালে পাঁচ আঙুলের দাগ বসিয়ে দিল সে। সে চায় কেষ্ট'র বিয়ে হোক, এবং বিয়েটা হোক তার সঙ্গেই।
তবে রাতারাতি যে সিদ্ধান্ত মৌবনী নিয়েছিল তা যে এরকম হাতাহাতির পর্যায়ে চলে যাবে, এতটা সে ভাবেনি। আসলে চায়ের দোকানে বেঞ্চের ডানদিকে বসে কেষ্টদা যে ন্যাকা ন্যাকা কথাগুলো বলছিলো, তা বুকের বাঁদিকে এসে ঠেকছিল মৌবনীর। খবরের কাগজটা গুটিয়ে রেখেছিল কোমরে। হাতদুটো গুটিয়ে রাখতে পারেনি। তো, সবার সামনে সপাটে প্রথম চড়টা খেয়েই রীতিমতো 'থ' হয়ে গিয়েছিল কেষ্টদা। বাকিগুলোর কথা মনে নেই! মৌবনীর এমন রুদ্র মূর্তি এর আগে দেখার সুযোগ হয়নি কেষ্টদার। সে স্বপ্নেও ভাবেনি এত কষ্টে আয়ত্তে আনা তার প্রেমিকাই নিউটনের তৃতীয় সূত্রের ব্যবহারিক প্রয়োগ ঘটাবে দিনেদুপুরে!
এরপর পাড়ার মোড়ে মোড়ে যে জল্পনার শুরু হল তা দুই পরিবারেরই কল্পনার বাইরে। সারা পাড়াতেই সাড়া পড়ে গেল। বিষয়টাকে অনর্থক বাড়তে না দিয়ে অর্থ দিয়ে মিটিয়ে নিতে চাইলেন কেষ্টদার বাবা। কিন্তু যার নাম 'অমূল্য' সেই ভদ্রলোক অর্থাৎ মৌবনীর বাবাকে কোনও মূল্য দিয়েই কেনা গেল না। ফাইনের হাতছানি ছেড়ে উলটে আইনের পথে যেতে চাইলেন তিনি।
'কেষ্ট'র জীবনটাই বরবাদ।' -------- সংবাদটা বাবার কাছে পেয়ে থানা, পুলিশ, হাজত ইত্যাদি শব্দগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগলো কেষ্টদা। বাংলায় কাঁচা হলেও এই শব্দগুলোর মানে খুঁজতে ডিকশনারি নিয়ে বসতে হবে না তাকে। তার চেয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসা ঢের নিরাপদ। অবশেষে কেষ্টদা রাজি হয়ে গেল।
ফুলশয্যার রাতে কনের সাজে মৌকে বেশ মোহময়ী লাগছিল কেষ্টদার। মৌ যে তার বিয়ে করা বউ এবং তারই ঘরে এসেছে, তা জেনেও এক পাশে কাৎ হয়ে শুয়ে পড়লো কেষ্টদা। একটু অন্যমনস্ক ছিল সে। হঠাৎ তার কাছে মুখ নিয়ে মৌ থুড়ি বৌ বললো, ' আমার পিঠে একটা মশা বসেছে, মেরে দাও না! '
কেষ্ট হাঁপ ছেড়ে বাঁচলো। যাক্ বাবা, আজ রাতে অন্তত চড়ানোর চড়ারোদ নেই!!
----------