বৃহস্পতিবার, ২ জানুয়ারি, ২০২৫

মুখোমুখি : সুজয় চক্রবর্তী


অল্প কথার কোলাজ পত্রিকায় প্রকাশিত সুজয় চক্রবর্তীর সাক্ষাৎকার

----------------------------------------


পত্রিকা: আপনার মতে অণুগল্প কি?

সুজয় : 'অণু' মানে ক্ষুদ্র, তাই তো? যে গল্প অতিশয় ক্ষুদ্র, অথচ খাঁটি গল্প, তাকেই অণুগল্প বলা চলে। স্বল্প শব্দ প্রয়োগে, যতটা সম্ভব বাক্য সংকোচন করে অণুগল্প লেখা হয়। খুব ছোট্ট করে হলেও একটা 'গল্প' যেন তাতে থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হয়। কেননা পাঠক শেষ পর্যন্ত গল্প চায়। বলাযায়, অণুগল্প একটা স্ফুলিঙ্গের মতো। একটা ঝলকানি। যা ক্ষণিকের জন্য স্থায়ী হবে, কিন্তু প্রত্যক্ষদর্শীকে তা প্রবলভাবে নাড়া দিয়ে চলে যাবে। যার রেশ থাকবে অনেকক্ষণ। যারা মনে করেন অণুগল্প লেখা সহজ, তাদের বলি অণুগল্প লেখা সবচেয়ে কঠিন। কি লিখব, কতটুকু লিখব, সেই বোধ যদি না থাকে, তবে তা আর যাইহোক অণুগল্প হবে না। একটা কথা দশটা না বলা কথার যে জন্ম দিতে পারে, তা সার্থক অণুগল্প পাঠেই বোঝা যায়। পাঠককে বিন্দুতে সিন্ধু দর্শন করাতে পারে একমাত্র অণুগল্পই। অণুগল্পের শেষ লাইনটাই হল পুরো গল্পের টার্নিং পয়েন্ট। পাঠকের জন্য একটা চমক থাকে সেখানে।


পত্রিকা : আচ্ছা। তাহলে ছোট গল্পের সঙ্গে এর পার্থক্য কোথায়?

সুজয় : ছোটগল্পের সঙ্গে অণুগল্পের পার্থক্যটা বেশিরভাগটাই ব্যাকরণগত। সরল অথচ ক্রিয়াপদহীন বাক্য, অসমাপিকা যুক্ত বাক্যের ব্যবহার অণুগল্পেই বেশি দেখা যায়। অন্যদিকে ছোটগল্পে সংলাপের প্রাধান্য থাকলেও অণুগল্প সংলাপহীনও হতে পারে। আবার অণুগল্পে উপমা ব্যবহারের চল খুব।
তাই বলে এই নয়, ছোটগল্পের ডালপালা ছেটে দিলেই সেটি অণুগল্প হয়ে যায়। কতটুকু লিখতে হবে, আর কতটুকু লেখার প্রয়োজন নেই, কিংবা কোথায় থামতে হবে, সেটা না জানলে কিন্তু অণুগল্প লেখা সম্ভবই না। ছোট ক্যানভাসে একটা বৃহৎ প্রেক্ষাপটকে ধরার চেষ্টা থাকে সেখানে।

এক্ষেত্রে আকার-আয়তনের প্রশ্নটি চলে আসবে। যদিওএ নিয়ে নানা মত আছে। তবে আমি মনে করি, পঞ্চাশ থেকে তিনশো শব্দের মধ্যে (খুব বেশি হলে সাড়ে তিনশো) যথার্থভাবে যদি গল্পটিকে তুলে ধরা যায়, তাহলে সেটি অণুগল্প। কিন্তু যা বলতে চেয়েছি, তা যদি তার বেশি শব্দের সাহায্য নিতে হয়, তাহলে সেটি আর 'অণু' থাকে না। 'ছোটগল্প' বলতে হয় তাকে। অণুগল্প লেখার সময় শেষটা আগে ভেবে রাখলে পাঠককে উৎকৃষ্ট অণুগল্প উপহার দেওয়া সম্ভব।

পত্রিকা : বেশ। অণুগল্প লেখার সময় আপনি বিষয়বস্তু কিভাবে নির্বাচন করেন?

সুজয় :  সব সময় বিষয়বস্তু নির্বাচন করে অণুগল্প লেখা সম্ভব হয়ে ওঠে না। অনেক সময় 'হঠাৎ'ই কোনও বিষয়ও আমার কাছে এসে ধরা দেয়। পারিপার্শ্বিক বা সমসাময়িক কোনও ঘটনা, চরিত্র, যা আমাকে নাড়া দেয়, তাকেই তখন বিষয় করে তুলি।


পত্রিকা : অণুগল্প লিখতে কেমন লাগে? লিখে সৃষ্টিসুখ পান?

সুজয় : অণুগল্প লিখতে ভালোই লাগে। ভালো না লাগলে লিখবো কেন? অণুগল্পে নিজেকে সচ্ছন্দবোধ করি বলেই তো যা ভাবি, তা অণুগল্পতেই তুলে ধরার চেষ্টা করি। তবে এটাও বলি, শুধু অণুগল্পই না, বেশ কিছু ছোটগল্পও আমি লিখেছি। সেগুলো প্রকাশিতও হয়েছে নানা বাণিজ্যিক - অবাণিজ্যিক পত্রিকাতে। এখন বই আকারে কবে সেটা পাঠকের হাতে তুলে দিতে পারছি, সেই অপেক্ষায় আছি।


পত্রিকা : বাংলা সাহিত্যে অণুগল্পকে আপনি কেমন স্থানে রাখেন?

সুজয় : বাংলা সাহিত্যে অণুগল্পের স্থান পাকা। 'সে' নিজেই তার স্থান দখল করে বসে আছে। আমার বলা না বলার উপরে 'তার' কিছু এসে যায় না। আসলে অণুগল্প তো আজকের ফসল না। অণুগল্প আগেও ছিল। শুধু 'অণু' নামটাই ছিল না। এইসব অতি স্বল্প পরিসরে রচিত গল্পকে কেউ কেউ তখন বলেছেন, গল্পিকা, কেউ বলেছেন, গল্পস্বল্প, কেউ বলেছেন, 'পোস্টকার্ড সাইজ' গল্প। বর্তমানে 'অণু' শব্দটি বহুল প্রচলিত, এই যা। বেঁচে থাকলে সাহিত্যিক বনফুলকেও এখন 'অণুগল্পকার' হিসেবে সম্বোধন করা হত। কেননা তারঁ বেশিরভাগ গল্প তো যথার্থ অণুগল্পই। তাই না? সত্তরের দশকের আগে পর্যন্ত পাঠক এগুলোকে গল্প হিসেবেই নিয়েছে। পরবর্তীতে 'পত্রাণু' আসার পর থেকে ধারণা পাল্টাতে থাকে।

এটুকু বলতে পারি, যতদিন যাচ্ছে অণুগল্পের প্রাসঙ্গিকতা বাড়ছে বই কমছে না। এখন পাঠকের হাতে সময় কম। বড়ো লেখা ধৈর্য ধরে কেউ পড়তে চায়ছেন না। সেইজন্যই তো প্রয়োজন হয়ে পড়েছে অণুসাহিত্যের। লেখা হচ্ছে অণুকবিতা, অণুরম্য, অণুপ্রবন্ধ এমনকি অণুউপন্যাস!

তবে একটা কথা, বেনোজল সব ক্ষেত্রেই ঢুকছে। সাহিত্যও এর ব্যতিক্রম নয়। সিরিয়াস পাঠকের নজরে সেইরকমই কিছু লেখা চলে এলে অণুগল্প সম্পর্কে একটা ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হচ্ছে। কেউ কেউ তো বলেই দিচ্ছেন, 'অণুগল্প হল এক ধরনের ফাঁকিবাজি সাহিত্যরচনা। 'সোস্যাল মিডিয়ায় চটজলদি কিছু লিখে অণুগল্প নাম দিয়ে তা চালিয়ে দিতে কারওর তো আর মনোনয়নের দরকার হয় না! তখন ঐ 'ভুষিমাল'গুলো সচেতন পাঠককে অণুগল্প সম্পর্কে এই ধারণার জন্ম দিচ্ছে। অণুগল্প লিখতে গেলে সাধনা দরকার। পড়াশোনা দরকার।


পত্রিকা : বর্তমান অণুগল্পকারদের মধ্যে আপনি কার কার লেখা পছন্দ করেন?

সুজয় : অনেকের লেখাই পছন্দ করি। সমসাময়িক অনেকেই খুব ভালো অণুগল্প লিখছেন। তাদের লেখা পড়ে অনেক কিছু শেখারও  আছে। এক ঝটকায় কিছু নাম বলে দিলে, আড়ালে থেকে যাবেন অনেক খ্যাতিমান অণুগল্পকার। তবে এটাও ঠিক যাদের লেখা পছন্দ করি তাদের সব লেখাই যে সবসময় ভালো লেগেছে, তাও  নয়। তবু বলবো, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বনফুলকে আমরা পাইনি। আমরা পেয়েছি স্বপ্নময় চক্রবর্তীকে। বর্তমানের একজন অন্যতম সেরা অণুগল্পকার তিনি।


পত্রিকা : আপনার কি মনে হয় অণুগল্প গল্পের সৃজনশীলতা নষ্ট করছে?

সুজয় : অণুগল্প কেন গল্পের সৃজনশীলতা নষ্ট করবে? এগুলো যারা রটায়, আমার মনে হয় তারা অণুগল্প কী, তা জানেনই না। আপনার মনের ভাব কখন কোন ফর্মে বা শেপে ধরা দেবে, তা আগে থেকে কি বলে দেওয়া সম্ভব?  কখনও তা গদ্যে ধরা দিতে পারে, কখনও তা পদ্যে। তাহলে আর কবিরা গল্প লিখতেন না। শক্তি চট্টোপাধ্যায়,  জীবনানন্দ দাশ, এমন কত কবি গল্প লিখেছেন। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কবিতা লিখেছেন। আসলে আপনি যা বলতে চায়ছেন, তার জন্য কোন মাধ্যমের আশ্রয় নেবেন, তা নিজেকেই ঠিক করে নিতে হবে। কবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটকের মতোই 'অণুগল্প'ও একটা মাধ্যম বা রূপ।

তবে চরিত্রগত দিক থেকে অণুগল্প কবিতার খুব কাছাকাছি, এটা বলা যায়। কেননা অণুগল্পের শরীর জুড়ে একটা কাব্যিক দ্যোতনা থাকে। একটা ঘটনা বলি, বেশ কিছুদিন আগে ফেসবুকে একটা অণুগল্প পোস্ট করেছিলাম। উত্তরবঙ্গের এক আবৃত্তিশিল্পী বন্ধু সেটি পড়ে আমার কাছে তা আবৃত্তি করার অনুমতি চান। আমি তাকে বলি, দাদা, এটাতো অণুগল্প! উনি বলেন, অণুগল্প হলেও এটাতে যে লিরিক আছে, তাতে আমার আবৃত্তিযোগ্য কবিতাই মনে হয়েছে। আমি আর না করিনি। এই প্রসঙ্গে আরও একটা মজার ঘটনা আছে, ২০১৬ সালের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা বইমেলাতে আর সকলের সঙ্গে আমিও এক কবি সম্মেলনে হাজির ছিলাম। আসলে আমার সাহিত্যবন্ধুদের বেশিরভাগই কবিতা লেখেন। তবে কবিতা যে আমি কোনও দিন  লিখিনি, তা নয়, কিন্তু  প্রায় ন'-দশ বছর আর লিখি না। তো, আমার এক শুভানুধ্যায়ী বন্ধু কোন ফাঁকে আমার নামটি মঞ্চের ঘোষকের কাছে বলে আসেন। অণুগল্পকার হিসেবে। আমি জানতাম না। কিন্তু মঞ্চে ঘোষক আমাকে আমন্ত্রণ করে বসলেন কবিতা পাঠের জন্য! অত লোকের মাঝখানে শেষে স্টেজে উঠতেই হল। এক মুহূর্ত না ভেবে যথারীতি একটা অণুগল্পই পাঠ করে বসলাম। গল্প পাঠের শেষে হাততালিও মিললো। স্টেজ থেকে নেমে দর্শকাসনে বসতেই একজন বললেন, আপনি আবার কবিতা লেখা শুরু করলেন না কি? বেশ হয়েছে। বললাম, দাদা, ওটা অণুগল্প ছিল। উনি তো থ'। বললেন, সবাইকে বোকা বানালেন! সত্যিই কেউ ধরতে পারেননি।


পত্রিকা : আপনার লেখা অণুগল্পের বইগুলি সম্বন্ধে কিছু বলুন।

সুজয় : আমার প্রথম অণুগল্প বের হয় আমারই সম্পাদিত 'পহিল' পত্রিকাতে, ২০০৩ সালে। তারপর থেকে পশ্চিমবঙ্গ ও বহির্বঙ্গের অসংখ্য পত্রিকাতে আমি অণুগল্প লিখেছি, এখনও লিখছি। কিন্তু দুই মলাটের মধ্যে অণুগল্পগুলো একত্রিত করার ভাবনা কোনও দিনই আসেনি। তবে এ যাবৎ বহু সংকলনে আমার অণুগল্প ঠাঁই পেয়েছে। গত বছর 'দুই দুগণে এক' নামে একটা অণুগল্পের বই  হঠাৎই বার করি ফেলি লেখক শাঁওলি দের সঙ্গে, যুগ্ম ভাবে। প্রকাশক : ইসক্রা। আর এবছর 'বালাই ষাট' নামে ষাটটি অণুগল্পের আমার একক বই বেরোলো, 'আকাশ' প্রকাশনী থেকে। বই দুটিতেই সমকালীন সমাজ জীবনের এক ফটোগ্রাফিক ছবি তুলে ধরার চেষ্টা করেছি, কতোটা পেরেছি, তা পাঠক বলবে, সময় বলবে।


পত্রিকা : যারা অণুগল্প নিয়ে কাজ করতে চায় তাদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।

সুজয় : অণুগল্প নিয়ে যারা কাজ করতে চান, তাদের উপদেশ দেওয়ার মতো জায়গায় এখনও আসিনি আমি। তবে এটুকু বলতে পারি, লক্ষে অবিচল থাকতে হবে। কেননা অনেকেই কান ভাঙাবে, অণুগল্প গল্পের প্লটটাকে মেরে ফেলে। তাই গল্প লেখাই শ্রেয়। অণুগল্প কি ও কেন, জানা থাকলে এক্ষেত্রে কাজ করতে সুবিধা হবে। শুধু অণুগল্প নিয়েই কাজ করছে পশ্চিমবঙ্গের, বহির্বঙ্গের একাধিক ছোট  পত্রিকা। যেমন,  এই মুহূর্তে মনে পড়ছে অণুপত্রী, অল্প কথায় গল্প পত্রিকা, অণুরণন, অণুগল্প পত্র, গল্প ইদানীং, কফি হাউস, অল্প কথার কোলাজ, সাহিত্য লহমা, হঠাৎ আলো, গল্পাণু, বাংলাদেশের 'অনুভূতি'। এছাড়াও কিছু ছোট পত্রিকাও আছে, যারা অণুগল্প নিয়ে কাজ করছে.... গল্পগুচ্ছ, ইসক্রা, অলিন্দ, ক্রন্দসী,  পারক, এরকম কতো পত্রিকা! তবে বাণিজ্যিক পত্রিকাগুলোও ইদানীং অণুগল্প প্রকাশ করছে। বর্তমান সময়ে অণুগল্প যে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে তা তারা বুঝতে পারছে।

শুধু অণুগল্প লিখেই যে বাংলা সাহিত্যে জায়গা পাকা করা যায়, তা তো স্বয়ং বনফুলই দেখিয়ে গেছেন। স্বনামধন্য লেখক স্বপ্নময় চক্রবর্তীও অণুগল্পের প্রাসঙ্গিকতা উপলব্ধি করে শুধুমাত্র অণুগল্পের উপরেই একটা বই লিখে ফেলেছেন! এছাড়াও অসংখ্য অণুগল্প লিখেছেন সমসাময়িক বর্ষীয়ান সাহিত্যিক সাধন চট্টোপাধ্যায়, রমানাথ রায়, অমর মিত্র, তপন বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ। এঁদের অণুগল্প পড়লে অণুগল্প চর্চা আরও মজবুত হবে, এই বিশ্বাস আছে।




             ধন্যবাদ।





---------------------------------------------------
  

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন