সোমবার, ২৪ মার্চ, ২০২৫

সুজয় চক্রবর্তীর গল্প : যেজন আছে মাঝখানে



ক্রমাগত হুমকির শিকার হচ্ছিল পলাশ। দাঁতে দাঁত চেপে এতদিন সব সয়ে যাচ্ছিল। এছাড়া তার আর কিছু করারও ছিল না। কিন্তু আজ যখন গায়ে হাত দিলো আব্দুলরা, ঘুষি দিয়ে মুখ ফাটিয়ে দিলো, তখনই সে স্থির করে নিয়েছিল আর পড়ে পড়ে মার খাওয়া যাবে না। পালাবে। তবে একা নয়, দুজনে।  

কলেজের ফাইনাল পরীক্ষা শেষ। বিকেলবেলা। আব্দুলদের পাঁচজনের দলটা ওকে যখন মারতে মারতে কলেজের মাঠের মাঝখানে নিয়ে গেল, তখন পলাশের গলার টুঁটি চেপে ধরে আব্দুল বলছিল, 'কাল থেকে তোকে যেন এলাকায় না দেখি। তাহলে কিন্তু ফল ভালো হবে না বলে দিচ্ছি।' পলাশ কিছু বলতে পারেনি। বলার চান্সই পায়নি। 

সারা কলেজ তখন হইহই রইরই অবস্থা। এলাকার প্রায় সব লোক ছুটে এসেছে সেখানে। কিন্তু কেউ আব্দুলদের হাত থেকে পলাশকে বাঁচানোর কোনো উদ্যোগই নিল না!  আসলে আব্দুলদের চেনে না, এলাকার খুব কম মানুষই আছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মার খেল পলাশ। ওর হয়ে কেউ বলবার ছিলো না তা নয়, বলেওছিল একজন, সে জাফর, 'ওই তোরা ওকে ছাড়। এই পলাশ শোন, মামনিকে যদি ভালোবাসিস, মামনিকে যদি বিয়ে করতে চাস, তাহলে মুসলমান হয়ে যা। কোনো বাঁধা থাকবে না। তখন তোর গায়ে হাত দেয় কোন কুত্তার বাচ্চা!' হাতের চেটো দিয়ে তখনও রক্ত মুছছে পলাশ। কোনো কথা বলেনি।

গণ্ডগোলের শুরু স্কুল থেকেই। কলেজে এসে সেই আগুনে ঘি পড়ছে শুধু। কো-এড স্কুলে ছেলেমেয়েদের মধ্যে একটু-আধটু প্রেম-টেম হয়। চিরকাল তা হয়েই আসছে। সব জায়গায়। তাই বলে একেবারে চিপকে যাওয়া কেস, এর আগে নিরঞ্জন ঘোষ স্মৃতি বিদ্যাপিঠে হয়নি, যেটা মামনি আর পলাশের মধ্যে হয়েছিল! কাঁঠালের আঠা নয় যে তেল দিলে উঠে যাবে। এ যেন ফেভিকুইক! পলাশরা দত্ত। কায়স্থ। মামনি খাতুন। মুসলিম ঘরের মেয়ে। দুটো ভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ছেলেমেয়ের প্রেম কারোর সমাজই মেনে নেবে না, তা ওরা ভালো করেই জানতো। তবু শেষ চেষ্টা করছিল, যদি প্রেমটা টিকে যায়! দুজনেই তাদের পরিবারকে বুঝিয়েছিল ; সমাজে যে এর অনেক উদাহরণ আছে তাও তুলে ধরেছিল তাদের সামনে। কিন্তু কোনো কাজই হয়নি। বরং অশান্তির আবহেই চলছিল দিনগুলো। কিন্তু স্কুল শেষের পর কলেজে প্রবেশ করেও মামনি ও পলাশ জিইয়ে রেখেছিল তাদের সম্পর্কটা, খুব আলতোভাবে। 
তবুও নজরে এসেছিল আব্দুলদের। আব্দুল মামনির চাচাতো ভাই। বাড়িতে সে আবার তুলেছিল এই সম্পর্কের কথা। তেলেবেগুনে জ্বলে উঠেছিলেন মিনারুল শেখ। মামনির 'আব্বু'। মামনির চুলের মুঠি ধরে বলেছিলেন, 'তুই এখনো ঐ ছোকরার সঙ্গে লাইন মারোস? আমার কথা কানে ঢোকে নাই!'

মাথা নিচু করে চুপ করেছিল মামনি। কথা বলেনি।
------ কিরে, কথা কইস না ক্যান? হাউস লাগসে? হাউস? মিটাচ্ছি তোর হাউস।
তার পরেই ঘটলো কলেজ-মাঠের এই ঘটনাটা। পলাশ মার খাওয়ার পেছনে মিনারুল শেখের যে সায় ছিল, এটা শুধু পলাশ কেন, সবাই বুঝেছিল তখন। 

এ নিয়ে পলাশের বাড়িতেও যে কম অশান্তি হয়নি, তা নয়। বেশ বড়ো রকমের অশান্তি হয়েছিল। পলাশের পাশে তখন কেউ নেই। পলাশের বাবা তো বলেই বসলেন, 'তুই যদি আর না শুধরাস, আমি আর তোর মুখ দেখবো না। তোর জন্য আমাদের মান-সম্মান সব ধুলোয় মিশে গেল! পৃথিবীতে আর মেয়ে ছিলো না! ওসব সিনেমাতেই ভালো লাগে। বুঝলে? বাস্তবে না। জানবি, আমি এসবের মধ্যে নেই।' এরপর পলাশের মা'ও আর কোনো কথা বলেননি। ঠারেঠোরে তিনিও যে অসন্তুষ্ট, বুঝিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু তাঁর চোখের কোণে তখন জল চিকচিক করছিল। 

মাঝে দিন চারেক সব ঠিক ছিল। কোনো বাড়িতেই তাদের সম্পর্কটা নিয়ে কোনো শব্দ খরচ করতে দেখা যায়নি কাউকে। ঠিক পঞ্চম দিনের মাথায় দুই বাড়ি থেকেই নিখোঁজ হয়ে গেল দুজন, পলাশ আর মামনি!
 
পলাশের বাবা ব্যাপারটা আন্দাজ করে রাগে পলাশকে 'ত্যাজ্যপুত্র' করলেন! আত্মীয়স্বজন তাঁকে হাজার বুঝিয়েও সিদ্ধান্ত থেকে সরাতে পারলেন না।

এদিকে মামনির 'আব্বু' মিনারুল শেখ মেয়ের খোঁজে 'লোক' লাগালেন। নিজেও গেলেন সঙ্গে। খুব একটা বেগও পেতে হলো না তাঁকে। খোঁজ পেলেন মামনির, সঙ্গে পলাশকেও। অনেক দূরে, যেখানে একটা ক্লাবের আশ্রয়ে রয়েছে তারা। মেয়েকে ঘরে ফেরানোর জন্য অনেক কাকুতিমিনতি করলেন মিনারুল। কাজ হল না। সঙ্গী এনায়েত সাহেব বললেন, 'মিনারুল, তুমার মেয়ে ভালো মোতো ওয়াশ হইছে। যা বুঝলাম! অরে আর ফিরে পাবা না।' উনি তফাতে সরে গেলেন। 
মিনারুল হাল ছাড়লেন না। পলাশকে স্বধর্মে নিয়ে আসতে মেয়েকে নানাভাবে বোঝানো শুরু করলেন তিনি। কিন্তু তাতেও কোনো ফল দিলো না। শেষে বাড়ি ফিরে এলেন  খালি হাতে। কেননা ক্লাবের সেক্রেটারি আগে থেকেই বলে রেখেছিলেন, 'আপনারা কাউকে জোর করবেন না। ওরা এখন প্রাপ্ত বয়স্ক। ওরা যেটা চায়, আপনাদের সেটা মেনে নিতে হবে। ওরা এখন আমাদের আশ্রয়ে আছে। নাহলে আমরা কিন্তু থানার দ্বারস্থ হবো।'

।।২।।
মামনি-পলাশও সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলেছিল ------দুজনের কেউই ধর্মান্তরিত না হয়ে এক ছাদের তলায় থাকবে। একাজে পাশে পেল ক্লাবকে। দিব্যি দিন কাটাতে লাগলো তারা। কোনো অসুবিধা হল না কারও। ওদের এই সিদ্ধান্তকে শুভকামনা জানিয়ে পাশে থাকার আশ্বাস দিলেন এলাকার বেশ কয়েকজন শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষও। কুর্নিশ জানালেন তাদের সিদ্ধান্তকে। এগিয়ে এলেন এক প্রবীণ নাগরিক। ওদেরকে আশীর্বাদ করে বললেন, 'সাধারণ স্তরেও মানুষের চিন্তা-ভাবনার বদল ঘটছে। শেষ পর্যন্ত যে আমরা সবাই মানুষ, বুঝতে পারছেন কেউ কেউ!'
দিন যায়। মাস যায়। বছর যায়। ইতিমধ্যে মামনির কোল আলো করে এসেছে তিয়াস, ওদের একমাত্র পুত্র সন্তান৷ নানা সুখদুঃখভয়ের মধ্যে দিয়েও মামনি ও পলাশ চাইলো, ছেলেটা মানুষের মতো মানুষ হোক। দেখতে দেখতে সে ছেলে এবার নয়ে পড়েছে।

এদিকে হজে যাওয়ার সুযোগ এসেছে মিনারুলের। হজে যাওয়ার আগে একবার মামনিকে দেখতে ইচ্ছা করছিল তাঁর। সেইমতো বাড়িতে পাড়লেন কথাটা। বিবি রুখসানাও মেয়েকে দেখেননি কতো বছর! তাঁর কৌতূহল, মামনিকে দেখতে এখন কেমন হয়েছে। দুইজনেই কাউকে না জানিয়ে মামনিকে দেখতে যাওয়ার পরিকল্পনা করলেন। সেইমতো প্রায় ১০ বছর পর মামনির আব্বু ও আম্মু পা রাখলেন  'জামাই'-এর বাসাবাড়িতে। অনেক বদল চোখে পড়ল মিনারুলের। মেয়ের চেহারা, পোশাক-আশাক, ব্যবহার এমনকি ঘর-দোর পর্যন্ত। 
পুরনো অশান্তির সব কথা ভুলে থাকলো পলাশ। বাজার থেকে 'শ্বশুর' মশাইয়ের জন্য বড় দেখে একটা কাতলা মাছ আনল সে। খাসির মাংসও আনলো। সে শুনেছে, শাশুড়ি বিরিয়ানি খেতে ভালোবাসে । 
মামনি এখন ভালো বিরিয়ানি রান্না করা শিখে গেছে। সব ঐ ইউটিউব দেখে দেখে। অনেকদিন পর আব্বু, আম্মুকে নিজের হাতে রান্না করে খাওয়াবে মামনি। তাই তার আনন্দ যেন আর ধরে না! সে এখন রান্নাঘরে।

পলাশ এখন একটা মাইক্রোফিন্যান্স কোম্পানির এরিয়া ম্যানেজার। তার কাজের চাপ অনেক। ছুটিতে বাড়িতে থাকলেও কাজ নিয়ে বসতে হয় তাকে। অফিসের কাজ নিয়ে সে বসেছে পাশের ঘরে।
রুখসানা বিবি যাত্রাপথের ধকল সইতে পারেননি। তিনি  ভীষণরকম ক্লান্ত। ঘুমিয়ে আছেন খাটের পরে। এদিকে যোহরের নামাজ শেষ করে বারান্দায় নাতির সঙ্গে 'গল্প' করছেন মিনারুল। গল্পের মাঝখানে হঠাৎ তিনি নাতি তিয়াসকে কোলের কাছে টেনে নিলেন। একথা সেকথার পর তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে মিনারুল বললেন, 'দাদু, মা মরলি, পুড়াইও না কিন্তু, কবর দেও। বুঝলে? আর শোনো, কারুরে যেন কইও না কথাটা।'
কথাটা যেন একটু জোরে বলা হয়ে গিয়েছিল মিনারুলের!  রুখসানা ঘুমাচ্ছেন, তাঁর শোনার কথা নয়। পলাশ পাশের ঘরে কাজে বেশ ব্যস্ত। কিন্তু রান্নাঘর থেকে মামনি কথাটা  শুনতে পেল। 
ধীরে ধীরে সে দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো। আব্বু ঠিক কী বলেছে জানার জন্য ছেলেকে সে বললো, 'কি হয়েছে তিয়াস, কবর নিয়ে কি বললে যেন?'

----- আমি না, দাদুভাই-ই তো বলছিল, তুমি মরে গেলে তোমাকে কবর দিতে। 

মামনি আব্বুর দিকে তাকিয়ে ক্ষণিকের জন্য চুপ করে থাকলো। ঘাবড়ে গিয়ে মাথাটা নিচু করে ফেললেন মিনারুল, মামনির 'আব্বু'।
আড়চোখে একবার মিনারুলকে দেখে নিয়ে মামনি বললো, 'আব্বু, দেহটা আমি দান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পোড়াতেও হবে না, কবরও দিতে হবে না। বুঝলে?'

মামনির কথাটা শোনার পর আবারও মিনারুল মাথাটা নিচু করেই রইলেন। মাথা উঁচু করার সৎ সাহস যে নেই তাঁর! 



-----------------

বুধবার, ১৯ মার্চ, ২০২৫

অভাগীর সুখ (শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'অভাগীর স্বর্গ' গল্প অবলম্বনে রচিত।) : সুজয় চক্রবর্তী

অভাগীর সুখ : সুজয় চক্রবর্তী 



[১]
শত চেষ্টা করেও যখন একটা কাঠ  জোগার করা গেল না, তখন নদীর চরে গর্ত খুঁড়ে অভাগীকে শোয়ানো হল। অভাগীর মুখে আগুন দিয়ে তার শেষ ইচ্ছে পূরণ করলো কাঙালি। তারপর মরদেহে মাটিচাপা দিলো শ্মশানযাত্রীরা।

যে খড়ের আঁটি জ্বেলে কাঙালি মায়ের মুখে আগুন দিয়েছিল, তার থেকেই কুন্ডলী পাকিয়ে পাকিয়ে ধোঁয়া উঠছিল উপরে। গালে হাত দিয়ে বসে সেদিকেই তাকিয়ে ছিল সে। মা বলেছিলো, 'ও ধূঁয়া না বাবা, সগ্যের রথ'। মুখুয্যে বাড়ির গিন্নির মতো মা-ও তবে আকাশপথে রথে চড়েই সগ্যে যাচ্ছে! একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দু'হাতের চেটো দিয়েআ১ চোখদুটো মুছলো কাঙালি। হঠাৎ রসিক এসে পিঠে হাত রাখলো তার। মুখ তুলে রসিকের দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকলো কাঙালি। 'এই লোকটা তার বাবা!' অব্যক্ত এক প্রতিশোধ স্পৃহায় তার সর্বাঙ্গ যেন জ্বলে যাচ্ছিল। কিন্তু কোনও কথা বললো না সে। মৃত মায়ের মুখটা মনে পড়তেই আবারও চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়লো কয়েক ফোটা। রসিকের হাতটা এক ঝটকায় সরিয়ে নিয়ে চোখটা মুছে নিল সে। তারপরই ছুট দিলো সামনের আম বাগানের দিকে। রসিক ডাক দিল অনেক করে,---- ‘ কাঙালি,  শোন বাবা, শোন।' কিন্তু কে শোনে কার কথা। সে ডাক কাঙালির কাছে বড়ো অচেনা ঠেকলো। সাড়া দিল না সে। কিছুটা দূরে গিয়ে 'থু' করে একদলা থুতু ছিটিয়ে ফেললো মাটিতে। 

আজ সারাদিন শুধু মায়ের কথাই মনে পড়ছে কাঙালির। মা’র সঙ্গে ‘সগ্যে’ গেলেই মনে হয় সবচে ভালো হত। জল আর বাতাসা খেয়েই না হয় থাকতো। তবু তো মা’র পাশে শুয়ে রাজপুত্তুর, কোটাল-পুত্তুর আর পক্ষীরাজ ঘোড়ার গল্প শোনা যেতো! এর জন্য মা’র ওপর তার একটু অভিমানও হল। মা কি তাকে ‘সগ্যে’ নিয়ে যেতে পারতো না? সে এখন কার কাছে থাকবে? কোথায় থাকবে? মা ছাড়া তো এই পৃথিবীতে তার কেউ নেই ! কে তাকে আদর করে ডাকবে ----‘কাঙালি , আয় বাবা, আমার কাছে আয়। পান্তাভাত নুন লংকা দিয়ে মেখেছি, দুটো খেয়ে নে।' মা কত দুঃখ করে বলতো, ‘কাঙালি, তুই বড় হয়ে আমার সব আশা মিটাবি বাবা, সব। তোর বাবা তো আমার কথা কোনও দিন ভাবলোও না।' তারপরেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতো, 'জানি না। আমার যা কপাল! কোনও দিন সুখের মুখ দেখবো বলে মনে হয় না!...কাঙালি তখন মায়ের কথা কেড়ে নিয়ে বলতো, ‘তুমি চুপ করো না মা, আমি তো আছি!’ 

আর সেইজন্যই বেতের কাজটা শিখছিল কাঙালি। এভাবে আর বছর খানেক কাটিয়ে দিতে পারলেই মা'কে একটু 'সুখের মুখ' দেখাতে পারবে ভেবেছিল সে। কিন্তু সে সুযোগ আর হলো না! মা'ই দিলো না। তার খালি মনে হয় মা যদি কবিরাজের ওষুধগুলো ঠিকমতো খেতো, তাহলে সুস্থ হয়ে যেতো। কিন্তু খেলো না তো! দুলে-বাগদিরা মানুষ না? তাদের শরীর খারাপ হবে না? তবে ওষুধ কেন খেলো না, মা?  

মা’কে হারিয়ে আজ মন ভারাক্রান্ত কাঙালির। খুব দুঃখী মা তার। অনেক কষ্ট সহ্য করেছে এ জীবনে। বাবা যখন মাকে ফেলে রেখে পাশ কাটালো অন্য মহিলার সঙ্গে, তখনও মা মুখ বুজে পড়ে থেকেছে গ্রামেই। কোথাও যায়নি। আর কোথায় বা যাবে? নিজের বলতে তো আর কেউ ছিল না। শুধু কাঙালি। গ্রামের সব দুলে বউ-ই তাকে বড়ো ভালোবাসতো। তারা বলতো, 'তার মতো 'সতী-লক্ষ্মী' বউ পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার।' অন্যের দুঃখে চোখের জল ফেলতো মা! রক্তের সম্পর্ক তো নেই-ই, কোনও ভাব-ভালোসার সম্পর্কও ছিলো না যাদের সঙ্গে, সেই বামুনদের গিন্নি মরলে যে মা কেঁদে ভাসায়, সে মা ভালো না হয়ে কি পারে? কিন্তু সবাই বুঝলেও কাঙালির আফসোস হয়, বাবা কেন তা বুঝলো না! না-কি বোঝার চেষ্টাই করলো না কোনও দিন। 
অনেকেই তো চেয়েছিল, কিন্তু একমাত্র কাঙালির জন্যই মা আর নিকে করেনি। কাঙালির মনে হয়, মা ভালোই করেছে নিকে না করে। মা যদি বাবার মতো নিকে করে অন্য গাঁয়ে চলে যেতো, তাহলে তো সে না খেয়েই মরে যেতো! তখন মা'কে জড়িয়ে ধরে গল্প শুনতো কে? কাজ কামাই করেও মা'র বুক ঘেঁষে শুয়ে রূপকথার গল্প শোনা যে কি আনন্দের তা শুধু কাঙালিই জানে। 

বাবার পায়ের ধুলো নিয়ে মা'র সগ্যে যাওয়ার শখ। কিন্তু কেন, মা, কেন! কী পেলে সারাজীবন? কিচ্ছু না। তোমার মৃত্যুর জন্য দায়ী যে লোকটা তার জন্য তোমার এতো ভক্তি কীসের? কেন তার পায়ের ধুলো! সে কি ভগবান? 
বাবার সামনে দাঁড়িয়ে আজ কতগুলো প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে ইচ্ছে করে কাঙালির। ---- মা থাকতে বাবা কেন আবার বিয়ে করেছে? আর বাবা হয়ে কাঙালির কোন আব্দারটাই বা সে রেখেছে? কিন্তু ইচ্ছে করলেও পারে না। মায়ের ছেলে যে সে! মা-ও পারতো না। মুখ বুজে থাকতো। তাই রসিক পাশে এসে দাঁড়ালে কাঙালি চুপ করে থাকলো।
অভাগীর অকাল মৃত্যু কাঙালিকে বাবা রসিকের কাছে নিয়ে এল বটে, তবে বেশ খানিকটা দূরত্ব রচনা করেই। একরাশ ঘৃণা ঝরে পড়লো কাঙালির ; বাবা রসিকের উপর, এই সমাজটার উপরেও । যে সমাজ জাত-পাতের দুয়ো দিয়ে মানুষের শেষ ইচ্ছে নিয়ে পরিহাস করে, কাঙালির ইচ্ছে করে ঘুণধরা এই সমাজটাকেই পুরো জ্বালিয়ে দিতে। আর জন্মদাতা পিতার খুব কাছে গিয়ে বলতে ইচ্ছে করে, ‘ তুমি একটা ঠগ, বুঝলে ? তুমি একটা ঠগ ‘।

[ ২ ]
বেতের কাজটা শিখছিল যখন ঠিক তখনই মা মারা গেল! আর সে কাজে আগ্রহ ছিল না কাঙালির। ছেড়ে দিয়েছিল।  

কাঙালি এখন নরেশ মিত্তিরের চালের আড়তে কাজ করে। নরেশবাবু লোকটা ভালো। মা-মরা ছেলেটার দুঃখ সহ্য করতে না পেরে নিজের আড়তেই কাজ জুটিয়ে দিয়েছেন। নরেশবাবুকে দেখে কাঙালির মনে হয় কিছু মানুষ এখনও আছে যাদের জন্য পৃথিবীটা এতো সুন্দর! যাদের পায়ের ধুলো মাথায় ছোঁয়ানো যায়।
টিফিন বাবদ রোজ পাঁচ টাকা মিলিয়ে মাসের শেষে কাঙালির হাতে থাকে প্রায় পঁচিশ'শ টাকার মতো। সৎভাই বিশুকে এবার দুর্গা পুজোয় নতুন জামা কিনে দেওয়ার কথা ভেবেছে কাঙালি। টাকা জমিয়ে জমিয়ে ইতিমধ্যে একটা পুরনো  সাইকেলও কিনে ফেলেছে সে। আড়তের কর্মচারী বৃন্দাবনের রেডিওটাও এখন কাঙালির জিম্মায়। বৃন্দাবন কাঙালিকে ছোট ভাইয়ের মতোই দেখে, তাই খুব কম দামেই দিয়েছে ওটা। বৃন্দাবন আরও কিছু জমিয়ে একটা টেপরেকর্ডার কিনেছে। রসিক বাড়ি থাকলে কাঙালির কেনা রেডিওটা চালিয়ে গান শোনে, শোনায় বিশুর মা’কেও।
রসিকের সংসারে এখন কাঙালির খুব কদর। কিছুদিন ধরে শুধু রসিক নয়, কাঙালির সৎ মা ও ভাই বিশুও তাকে বেশ সুনজরেই দেখছে। কাঙালি তার কারণটা বোঝে। তার শুধু মনে হয়, যদি মা বেঁচে থাকতো এখন, কতো আনন্দই না পেতো! মা বেঁচে থাকলে তার হাতে নতুন কাপড়ের প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে পরনের ছেঁড়া কাপড়টা বদলে আসতে বলতো কাঙালি। কিন্তু সেতো আর কোনও দিনই হওয়ার নয়! 
মাঝেমধ্যে রসিক যখন তার দ্বিতীয় গিন্নির সঙ্গে রসিকতায় মেতে ওঠে, কাঙালির তখন খুব মনে পড়ে মায়ের মুখটা। গালে হাত দিয়ে ভাবে ------মা’কি দেখতে সেই তেমনই আছে? মা কি এখনও তাকে ডাকে? সে ছাড়া মা'র যে আর কেউ নেই, কেউ ছিলো না কখনও।

[ ৩ ]
আজ নরেশবাবুর কাছ থেকে মাসের মাইনে হাতে পেয়ে খুশিতে মন ভরে গেল কাঙালির। প্রথমেই মনে পড়লো বিশুর কথা। বিশু কালকে মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খাওয়ার বায়না ধরেছিলো বাবার কাছে। আজ তাই বাজার থেকে একটু মাছ নিয়ে যেতে হবে বাড়িতে। নাহলে খারাপ দেখায়৷। হাজার হোক সে তো বয়সে ছোট!
মা মাছ খেতে বড়ো ভালোবাসতো। বিন্দিদের বাড়ি থেকে যখন মাছ ভাজার গন্ধ আসতো নাকে, তখন মা বলতো, 'কাঙালি, তুই তাড়াতাড়ি বড়ো হ' বাবা।  কাজ করে যখন টাকা নিয়ে আসবি বাড়িতে, তখন আমরাও মাছ খাবো। ওদের থেকে ভালো মাছ খাবো আমরা।' কাঙালি আপনমনে বিড়বিড় করলো, 'আজ বাড়িতে মাছ নিয়ে যাবো,মা। কিন্তু তুমিই তো নেই!' 
সন্ধ্যের দিকে মাছ বাজার থেকে পাঁচশো বাটা মাছ আর নিরঞ্জন ঘোষের দোকান থেকে পাঁচশো জিলিপি কিনে বাড়ি ফিরলো কাঙালি। 
রসিক আজ কাজে যায়নি। মানে কাজ হয়নি। রাজমিস্ত্রীর যোগাড়ে সে। ইদানিং প্রায়ই তার কাজ হচ্ছে না। বাড়িতেই ছিল। চারজনে একসঙ্গে বসে কাঙালির আনা জিলিপি খেল আনন্দ করে। রেডিওতে তখন গান চালিয়েছিল রসিক। খাওয়া-শেষে বিশুর মা মাছগুলো নিয়ে চলে গেল রান্নাঘরে। রসিক রেডিওটা নিয়ে নেমে গেল উঠোনে। 
একে তো চৈত্রের শেষ, তায় আবার গাছের পাতা একটাও নড়ছিল না। সারাদিনের ক্লান্তি তিন বালতি জলে মিটিয়ে নিলো কাঙালি। তারপর স্নান সেরে, চুল আচড়ে ঘরের দাওয়ায় এসে বসলো। সঙ্গে সঙ্গে কোথা থেকে বিশু এসে একটা হাতপাখা দিয়ে গেল কাঙালিকে! পাখার হাওয়া খাচ্ছিল কাঙালি। হঠাৎ তেল উঠে দপ্ দপ্ করতে করতে হ্যারিকেনটা গেল নিভে। 
হাতপাখাটা রেখে হ্যারিকেনটা নিয়ে বসলো কাঙালি। পাশে দাঁড়িয়ে টর্চের আলো ফেলছিল বিশু। এমন সময়ই রসিকের চিল-চিৎকার শোনা গেল। সঙ্গে সঙ্গে রান্নাঘর থেকে লম্প হাতে বেরিয়ে এল বউ। কাঙালিও তখন একছুটে বাইরে। ঠিক কাঁঠাল গাছটার নিচে শুয়ে ছটফট করছে রসিক। তার মুখ দিয়ে শুধু গ্যাজলা বেরচ্ছে। অন্ধকারেও পুরো ব্যাপারটা পরিস্কার হয়ে গেল। লম্পের আলোয় দংশনের জায়গাটা দেখেই আঁতকে উঠলো বউ। গ্রামের মেয়ে সে। সাপ চেনে। জাত সাপে কামড়েছে রসিককে!

রাতেই কাঙালি ছুটলো নবীন ওঝার বাড়ি। সাইকেলে প্রায় আধ ঘন্টার পথ সে পনেরো মিনিটে এসে পৌঁছালো! তারপর ওঝা এল বাড়িতে। ঝাড়ফুঁকও হল। কিন্তু রসিকের আর জ্ঞান ফিরলো না। 
রাতটা কাটলো কোনওরকমে। ভোর হতেই মরাকান্না শুনে ভিড় জমালো পড়শীরা। ঈশ্বর নাপিতের ছেলে বিভূতি এসে নাড়ী টিপে দেখলো। তারপর মাথা নাড়িয়ে জানান দিলো, সব শেষ! শ্মশানে নিয়ে যাওয়া হল রসিককে। কাঙালি বড়ছেলে। নিয়মমতো তাই তাকেই মুখাগ্নি করতে হল। এরপর নদীর চরে গর্ত খুঁড়ে পুঁতে দেওয়া হল রসিকের দেহটাকে। মাটিচাপা দিল দুলে পাড়ার দু-একজন। সৎভাই বিশুর কাঁধে হাত রেখে ভরসা দিল কাঙালি ।
 হাত জোড় করে প্রণাম করে আকাশের দিকে তাকিয়ে কাঙালি মনে মনে বললো , ‘ মা, বাবাও দেখো সগ্যে যাচ্ছে, এবার তুমি সুখী হবে।'


* শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘অভাগীর স্বর্গ’ গল্প অবলম্বনে নবনির্মাণ। 

---------------