বৃহস্পতিবার, ২ জানুয়ারি, ২০২৫

সুজয় চক্রবর্তীর সঙ্গে বিল্লাল হোসেন

অণুগল্প বিষয়ে সুজয় চক্রবর্তীর সাক্ষাৎকার

 

বিশ্বসাহিত্যে অণুগল্প নানা নামে নিয়মিতই চর্চা হচ্ছে । একেক দেশে এর একেক নাম । একেক ধরণ। এ-ও বলা দরকার যে, সেসব বাহারি নামের অণুগল্প কোন প্রকার থিউরি বা তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। সুনির্দিস্ট লেখনশৈলী, অবকাঠামো  ,সংজ্ঞা-কে কেন্দ্র করে হয়ে ওঠেনি। ফলে অণুগল্প বা অণুগল্পের সাদৃশ্যমূলক  ছাড়াছাড়া এইসব অণুগল্প, অণুগল্পের সারাৎসার হিসেবে শুধু‘স্বল্পায়তন’-কে মেনে নিয়েছে। লেখকদের মধ্যে আর কোন সাযুজ্য খুঁজে পাওয়া যায় না। আবার, এ-স্বল্পায়তনের ধারণাও একেক লেখকের কাছে একেক রকম ।

অন্যদিকে, বাংলাভাষাতেও অণুগল্প চর্চা হচ্ছে । তবে এই চর্চার পেছনে কিছু  সংবিধিবদ্ধতা কাজ করছে । একটি অণুগল্পের সৌন্দর্যবিকাশে কিছু কিছু শৈলী / অবকাঠামো/ সংজ্ঞা নিরূপণ করে লিখিত হচ্ছে অণুগল্প । এবং ‘অণুগল্প’ গ্রুপকে কেন্দ্র করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একদল অণুগল্পকার ।  ‘স্বল্পায়তন , বহুস্বর , রহসয়ময়তা , শুরুর ম্যাজিক , বিস্ময় পরিণতি , যতিচিহ্ন , উল্লম্ফন , বিষয়বস্তু , কমপ্যাক্ট , টুইস্ট/ মোচড়/অভিঘাত— অণুগল্পের এইসব উপাদানকে সামনে রেখে লিখিত হচ্ছে একেকটি সার্থক অণুগল্প । আর এইভাবে বাংলাসাহিত্যে অন্যান্য শাখার মত [ কাব্য , ছোটগল্প , প্রবন্ধ , উপন্যাস ] অণুগল্প একটি স্বতন্ত্র শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে । যার উদাহরণ আপনার সম্পাদিত পত্রিকা । আমরা লক্ষ্য করেছি, অন্যান্য বিভাগের মত সম্পুর্ণ আলাদা বিভাগ করেই অণুগল্পকে স্থান করে দিয়েছেন।

(সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিলাল হোসেন)।
....................................................................................................


প্রশ্ন-১
অণুগল্পের প্রতি আপনার এই ভালবাসা/ মমত্ববোধের কারণ কি ?

উত্তর : কারণটা খুবই সোজা। বার বার যার কাছে নিজেকে সঁপে দিই, তাকে না ভালোবাসলে তো সেটা সম্ভবই হত না, তাই না!  'মাথার ভেতর যে বোধ' কাজ করে, তা ব্যক্ত করতে তো অণুগল্পকেই আশ্রয় করি। সেই থেকেই তার প্রতি এক প্রকার মমত্ববোধ গড়ে উঠেছে। আর যাকে ভালোবাসি, তার সঙ্গে চলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।

প্রশ্ন-২ বাংলাসাহিত্যে একটি স্বতন্ত্র শাখা হিসেবে ‘ অণুগল্প’ আবির্ভুত হতে যাচ্ছে । আপনার কাছে কেন মনে হয় , কোন কোন কারণে  কবিতা , ছোটগল্প ,প্রবন্ধ্‌, ছড়া –এইসব শাখার পাশাপাশি অণুগল্প স্বতন্ত্র শাখা হয়ে উঠবে/ উঠছে?

উত্তর : অণুগল্পকে স্বতন্ত্র শাখা না বলে একটা আলাদা 'আর্ট-ফর্ম' বলা যেতে পারে। কেননা অণুগল্প তো শুধু আজকের রূপভেদ নয়। আধুনিক অণুগল্পের জন্মই হয়েছে প্রায় একশো  বছর আগে। তখন 'অণুগল্প' শব্দদ্বয়ের প্রচলন ছিল না, এই যা। রবীন্দ্রনাথ, বনফুলের লেখা তো তারই প্রমাণ দেয়। বিদেশে তারও আগে। তাই হঠাৎ করে এটা একটা 'শাখা' হয়ে উঠছে না। প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল অনেক আগে থেকেই। এদেশে সলতে পাকানোর পর্বটা করে গিয়েছিলেন, রবীন্দ্রনাথ, বনফুল থেকে শুরু করে মানিক, শৈলজানন্দ প্রমুখ।

তবে কথাসাহিত্যে কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাসের পাশাপাশি অণুগল্পও তার স্বতন্ত্র জায়াগা করে নিতে পেরেছে, এটা এক বাক্যে সবাই স্বীকার করবেন। আসলে ইদানীং অণুগল্প বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কেননা শুধু অণুগল্পকে কেন্দ্র করেই একাধিক ছোট পত্রিকা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে চলেছে।  প্রবীণ লেখকরাও এখন অণুগল্প লিখছেন। কমার্শিয়াল পত্রিকাও এখন অণুগল্প ছাপছে। কারণটা আর কিছুই নয়, তা হল সময়। পাঠক চাইছেন খুব অল্প সময়ে সাহিত্যের রসাস্বাদন করতে। আর তাই হাতে তুলে নিচ্ছেন ক্ষুদ্র পরিসরের এসব গল্পগুলোকে।

প্রশ্ন-৩
৩) বাংলাদেশের জাতীয় পর্যায়ের দৈনিক ও সাহিত্য পত্রিকায় এখনও নিয়মিত ভাবে অণুগল্পের জন্য কোন আলাদা জায়গা বরাদ্দ করা হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে আমরা কী করতে পারি?

উত্তর : পূর্ববঙ্গে না হলেও পশ্চিমবঙ্গে বেশ কিছু জাতীয় পর্যায়ের দৈনিকে বা সাহিত্য পত্রিকাতে অণুগল্প ছাপা হচ্ছে। সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে অণুগল্পের জন্য বরাদ্দ থাকছে নির্দিষ্ট পৃষ্ঠাও।

বাংলাদেশে এটা করতে গেলে বর্তমানের জনপ্রিয় লেখক যারাঁ আছেন, তাদেরঁ দিয়ে অণুগল্প লিখিয়ে নিতে হবে। কেননা, তারাঁ কমার্শিয়াল পত্রিকার পরিচিত মুখ। তারাঁ যদি অণুগল্প লেখেন, তবে বড়ো প্রকাশনাগুলো অণুগল্প বিষয়ে আগ্রহী হবেন বলেই আমার বিশ্বাস। আর এই বড়ো প্রকাশনা থেকেই তো জাতীয় পর্যায়ের বেশির ভাগ দৈনিকগুলো বের হয়, তাই না?

প্রশ্ন-৪
আপনার সম্পাদিত ছোটকাগজে অণুগল্প বিষয়ক ‘একটি অণুগল্প সংখ্যা’ বের করার কোন পরিকল্পনা আছে কি ?

উত্তর : আমার সম্পাদিত পত্রিকা 'পারক', গল্প ও গল্প বিষয়ক পত্রিকা। তেরো বছর পূর্ণ করলো। পত্রিকার সব সংখ্যাতেই ছোটগল্প, অণুগল্প, গল্প বিষয়ক প্রবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও গল্পের বইয়ের আলোচনা থাকে। তবে প্রতিটা সংখ্যাতেই অণুগল্পের উপরে বিশেষ জোর দিই। তাছাড়াও ২০১২  সালের শারদ সংখ্যা 'অণুগল্প সংখ্যা' হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে। ভবিষ্যতেও 'অণুগল্প সংখ্যা' করার ইচ্ছে আছে।

প্রশ্ন-৫
বিশ্বসাহিত্যে অণুগল্প আজ একটি জনপ্রিয় ও প্রতিষ্ঠিত ধারা । এবিষয়ে বুকার/ নোবেল পুরস্কারও কেউ কেউ পেয়েছেন ।অথচ আমাদের দেশে অণুগল্প বিষয়ে অনেকেই উন্নাসিকতা দেখাচ্ছেনই শুধু না বিরোধিতাও করছে ,নীরবে/ সরবে । এবিষয়ে আপনার অভিমত কি ?

উত্তর : কে কি বললো, এ নিয়ে না ভেবে আমরা যারাঁ অণুগল্প চর্চা করি, তা নিবিষ্ট মনে করে যেতে হবে। আমিও অনেককে বলতে শুনেছি, 'অণুগল্প এক প্রকার ফাঁকিবাজি সাহিত্য রচনা।' এটা যারাঁ বলেন, তারা অণুগল্প কি, সেটাই জানেন না। অণুগল্প লেখা খুব কঠিন। যারাঁ সেটা পারেন না, আমার মনে হয় একমাত্র তারাই অণুগল্পের বিরূপ প্রচার করেন।

প্রশ্ন-৬
অণুগল্পের ভবিষ্যৎ কি রকম ?

উত্তর : ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা না হয়েও বলা যায়, অণুগল্পের ভবিষ্যৎ বেশ উজ্জ্বল। সময়ের দাবি মেনেই অণুগল্পের এত জনপ্রিয়তা।  আমার তো মনে হয়, একটা সময় শুধু অণুগল্পই মানুষ পড়বে। সে শুধু সময়ের অপেক্ষা।





         ----------


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন