রবিবার, ৬ জুলাই, ২০২৫

সুজয় চক্রবর্তীর গল্প : চক্রান্ত


হাসতে হাসতে চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে যেত মেয়েটার। সব কথাতেই একগাল হেসে কথা বলতো ও। ওকে কখনও মুখ কালো করে বসে থাকতে দেখেনি কেউ। আর ওর জন্যই তো স্কুলে ক্লাসের গোমড়ামুখোগুলোও না হেসে পারতো না। এখন সেই হাসিখুশি, মিষ্টি মুখের মেয়েটাই একদম চুপ! ভীষণ রকম চুপ। সে যেন হাসতেই ভুলে গেছে! 

থার্ড ইয়ারে পড়ার সময়ই বিয়েটা হয়ে গেল ওর। ওর মানে শেফালির। প্রেমটেম না, অ্যারেঞ্জড ম্যারেজ। সম্বন্ধটা দিয়ে ছিল বিন্নি পিসি। একটাই তো পিসি ওর। পৈতৃক সম্পত্তি নিয়ে দাদার সঙ্গে মন কষাকষি চললেও শেফালিদের দুই বোনকে পিসি নিজের মেয়ের মতোই দেখে এসেছে। মেয়েটা ভালো ঘরে যাক, ভালো বর পাক, তিনি তো চাইবেনই! তাই শুধু সম্বন্ধই দিলো না বিন্নি পিসি, সঙ্গে সার্টিফিকেটও দিয়ে বসলো পাত্রের। কোনও নেশা নেই ছেলের। যেমন গুণ, তেমন তার রূপ! একটাই ছেলে। সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। মাস পুরলে মোটা টাকা বেতন। বিয়ের বাজারে এমন ছেলের ডিমান্ড সবসময়। তাই শেফালির বাবাকে পিসি বলেছিল, 'দেরি করিস না দাদা। শুভ কাজ তাড়াতাড়ি হওয়াই ভালো।' ঝামেলা যাই হোক না কেন একমাত্র বোনকে প্রলয় দত্ত মানেও খুব। তাই ইঞ্জিনিয়ার পাত্রকে দত্ত বাড়ির বড়ো জামাই করে নিতে, দুবার ভাবলেন না তিনি। শেফালির বাবা। বিয়ে পাকা করে ফেললেন। 

কিন্তু এতো 'সকাল' 'সকাল' বিয়ে করার ইচ্ছে শেফালির মোটেও ছিল না। সে চেয়েছিল পড়াশোনা করে আগে নিজের পায়ে দাঁড়াতে । চেয়েছিল মা-বাবার ছেলের অভাব পূরণ করতে। 

মা শেফালিকে বোঝালো অনেক। বাবা গো ধরে বসে থাকলো।

----'এই পাত্রই শেফালির জন্য উপযুক্ত। আমার কোনও ছেলে নেই। দুটোই তো মেয়ে। তাই ভালো ঘরে, ভালো ছেলে দেখে মেয়ে দুটোর বিয়ে দিতে পারলেই নিশ্চিন্ত। পড়াশোনা সে যে করেনি, তা তো নয়! আর নিজের পায়ে দাঁড়ানো বললেই হল! এই বাজারে চাকরি? কত এম.এ, বি.এড ঘুরে বেড়াচ্ছে রাস্তাঘাটে। তাছাড়া বিয়ের বয়েস কি ওর হয়নি? '

শেফালি এখন ২৩। বিয়ের বয়স তার হয়েছে। এটা সেও জানে। মা'র যখন বিয়ে হয়, মা'র বয়স তখন ১৯ বছর। তাবোলে সেই সময়টার সঙ্গে এখন কি মেলানো ঠিক হবে? এখনও তো তার অন্য বন্ধুরা পড়াশোনা করছে! না, একথা বাবাকে সে বলতে পারেনি। সবটাই মনে মনে। শেষে একটা ক্ষীণ আশা দেখতে পেল হবু শ্বশুরের কথায়, 'বিয়ের পরেও চাইলে বউমা পড়াশোনা করতে পারে', এই আশ্বাসে রাজি হয়ে গেল সে। 

ঘটা করে বড়ো মেয়ের বিয়ে দিলেন প্রলয় দত্ত। পাত পেড়ে খেয়ে গেল আত্মীয়-বন্ধুরা। শুভেচ্ছা জানিয়ে গেল তাদের সংসার জীবনের। 

বরাবরই মিশুকে শেফালি। কি ছোট কি বড়। সবার সঙ্গেই ও খুব সহজেই মিশে যেতে পারে। কোনও ইগো নেই। ওর এই হাসিখুশি স্বভাবটার জন্যই পাড়াতে বড়ো প্রিয় ছিল সবার। শ্বশুরবাড়ির পাড়াতেও খুব অল্প দিনের মধ্যেই সে সকলের প্রিয় হয়ে উঠলো। 

দূর শিক্ষায় এম.এ তে ভর্তি হল শেফালি। বাংলায়। পলাশ চায়নি। চায়নি এই কারণেই, সে তো আর কোনও অভাব রাখেনি সংসারের! বউকে পড়াশোনা করিয়ে চাকরিতে পাঠাবে, এমন হালও তার হয়নি। তাছাড়া ঘরের বউ ইউনিভার্সিটির ঐ আঁতেল ছেলেগুলোর গা ঘেঁষে বসবে, এ তার সহ্য হবে না। আপত্তি ছিলো প্রচুর। এক প্রকার জেদ করেই পড়াটা আবার শুরু করলো শেফালি। 

কিন্তু শেফালির এই হেসে হেসে কথা বলাটা পলাশের একদম না-পসন্দ। সেই প্রথম দিন থেকেই। বিশেষ করে যখন পাড়ার কোনও পুরুষ মানুষের সঙ্গে শেফালি কথা বলতো, জ্বলে যেত পলাশের ভেতরটা। সে শুধু পলাশের। শুধু তার সঙ্গেই সে এভাবে কথা বলতে পারে। এই ভাবনাটা পলাশের ভেতরে গেঁথে ছিল। তাই মুখে কিছু না বললেও আকারেইঙ্গিতে বেশ কয়েকবার বুঝিয়েছে সেকথা। কখনও শেফালি বুঝতো, কখনও বুঝতো না। আসলে জন্মগত স্বভাবটা কি অত সহজে যায়! 

নানা কারণে শেফালিকে নিয়ে পলাশের ভেতরে একটা সংশয় কাজ করতো। দিনের পর দিন নানা অছিলায় তার প্রকাশ দেখা দিত  পলাশের আচরণে। শেফালি সাধ্যমতো চেষ্টা করতো, পলাশের  ভুলগুলো ধরিয়ে দেওয়ার, কিন্তু বার বার সে ব্যর্থ হতো। তখন বালিশে মুখ গুঁজে কান্না ছাড়া তার  আর কোনও উপায় থাকতো না।

ক্রমে শেফালি বুঝতে পারলো আসলে কাউকেই পলাশ বিশ্বাস করে না। সবসময় একটা সন্দেহ দানা বেঁধে থাকে তার মনে। পলাশের খালি মনে হয়, সারা দুনিয়া যেন ওর বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে। ঘোর চক্রান্ত। এখন সেই দলে ভিড়েছে শেফালিও!

শুধু বাড়িতেই নয়, অফিসেও সেই এক ব্যাপার! কলিগরাও বিষয়টা জানে। আর তাই আড়ালে তাকে নিয়ে হাসিঠাট্টাও করে। কেউ যদি কারও কানের কাছে মুখ নিয়ে আড়চোখে পলাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিসিয়ে কিছু বললো, অমনি পলাশ 'বুঝে' গেল, নিশ্চয় তার নামেই কিছু বলছে! 

প্রথম প্রথম শেফালি এসব জানতে পারেনি। সময় লেগেছে, অনেক পরে। আর যখন জানতে পারলো, সে রোগ তখন ছোঁয়াচে রোগের মতোই ছড়িয়ে পড়েছে পলাশের মগজে। 

ইদানিং পলাশের মনে হচ্ছে শেফালি নিশ্চয় তার কাছে কিছু লুকোচ্ছে। এই বয়সের মেয়ে পরপুরুষে মজে যেতে কতক্ষণ?  নাহলে সেদিনের ছোকরা দুলালের সঙ্গে তার এত কিসের কথা! কিসের এত ভাব! সে যখন বাড়ি থাকে না, এই দুলাল যে তাদের বাড়িতে আসে না কে বলতে পারে? তাই সে ঠিক করেছে বাড়িতে সিসি ক্যামেরা বসাবে। কল করেছিল গোবিন্দকে। আজ ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রি গোবিন্দ এসে ঘুরে গেছে। আপাতত চারটে লাগাবে। পুরো বাড়িটা ধরা না গেলেও বোঝা যাবে, বাড়িতে কে ঢুকছে, কে বেরোচ্ছে। পরে বাড়াবে। 

----- বুঝলে, কাল গোবিন্দ আসবে। এগুলো ওকে দেবে। 

পলাশের হাতে সিসিটিভি ক্যামেরার প্যাকেটগুলো দেখতে পেয়ে শেফালি বললো, ' এগুলো কেন  হঠাৎ? '

------ হঠাতের কি আছে, মা-বাবা অসুস্থ। বয়স হয়েছে। তুমি একা মেয়েমানুষ। কখন কি বিপদ হয়৷ বলা যায়? তাছাড়া পাড়ার ছেলেগুলোও খুব একটা সুবিধের  না। তোমাকে কতবার বারণ করেছি, ওদেরকে পাত্তা দিও না। ওদের সঙ্গে কথা বলার দরকার নেই। তুমি শুনলে তো! 

----- ও, এই ব্যাপার? সত্যি তোমার মানসিকতা যে এত নিচে নেমে গেছে, ভাবতে পারছি না, পলাশ! কি বলোতো, তোমার সঙ্গে রাত কাটানো যায়, কিন্তু সংসার করা যায় না, বুঝলে?'


ব্যস, আর কথা বাড়ায়নি শেফালি। 

শেফালির এখন খুব মনে পড়ছে বিন্নি পিসির কথা। তার দেওয়া 'সার্টিফিকেট' বাবা তখন লুফে নিয়েছিল। খোঁজও নেয়নি ছেলের।বিন্নি পিসি খালি জোর দিয়েছিল, 'মোটা টাকা'র উপরে। গাড়ি, বাড়ি, কারি কারি টাকা, সত্যিই এসব কিছু চায়নি শেফালি। চেয়েছিল একজন ভালো মনের মানুষকে। পায়নি। কাকে বলবে এসব! শুধু মাকে বলেছে। আর সব মায়েদের মতোই শেফালিকেও মা বলেছে,  'আরেকটু ধৈর্য ধর, মা। দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে।' না, কোনও কিছুও ঠিক হয়নি। 

শেফালিও ভেবেছিল, বাচ্চাকাচ্চা হয়ে গেলে পলাশ ঠিক চেঞ্জ হয়ে যাবে। ভুল ভেবেছিল। তুতুল আসার পরেও সেই একইরকম থেকে গেছে সে। আসলে শেফালি তাকে তখনও চেনেইনি।

অবশেষে একদিন সেই কঠিন সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেললো শেফালি। সেপারেশন । জাস্ট আর পারছে না সে। 

মামলা কোর্টে উঠলো৷ কিন্তু আদালত বিচ্ছেদ না করে দু-জনকে আলাদা থাকার পরামর্শ দিলো, যাতে নিজেদের ত্রুটিগুলো বুঝতে পেরে আবার একসঙ্গে তারা পথ চলতে পারে। শেফালি রাজিও হল। কিন্তু এক বছর আলাদা থাকার পরেও পলাশ যেখানে ছিলো, সেখানেই। একচুলও নড়েনি এদিকসেদিক! 

এখনও পলাশের সঙ্গে ডিভোর্সের মামলাটা ঝুলছে । পলাশ ডিভোর্স দিচ্ছে না। শেফালি তাহলে বাঁচে!  অনেক দিন হয়ে গেল শেফালি পলাশের মুখোমুখি হয়নি ।  মুখোমুখি হতে ও চায়ও না। সে অনেক চেষ্টা করেছিল পলাশকে শুধরে নেবার। পারেনি। জানে না, এ তার অক্ষমতা কি না। কিন্তু জোড়াতালি দিয়ে আর কতদিন চালানো যায়!

এখন শেফালির ঠিকানা '১০ এ ঘোষ পাড়া লেন, কলকাতা - ৩৬।' বাপের বাড়ি। একটা বাচ্চাদের স্কুলের দিদিমনি সে। অফ টাইমে প্রাইভেটও পড়াই। মা আর ছেলেতে থাকে। সে স্কুলে চলে গেলে তুতুলের দেখভালের দায়িত্ব পড়ে দাদু-দিদার উপর। কতক্ষণ আর ভালো লাগে দাদু-দিদার শাসন! তাই শেফালি বাড়ি ফিরলেই মাকে কাছছাড়া করতে চায় না তুতুল। 

'জানেন দিদি, আজকাল আমার আত্মহত্যা করতে ইচ্ছে করে খুব।দড়ি আমাকে ডাকে।....ভীষণভাবে ডাকে, জানেন? ' কথাগুলো লিটনের মাকে বলছিল শেফালি। লিটনকে প্রাইভেট পড়াই সে।  

---- এ কি বলছো, শেফালি ! 

---- হ্যাঁ, ঠিকই বলছি। আর বাঁচতে ইচ্ছা করে না! তুতুল না থাকলে আমি পৃথিবী ছেড়ে কবে চলে যেতাম! '

তুতুলকে ছাড়া এক মুহূর্ত ভাবতে পারে না শেফালি। ওকে যে করেই হোক, মানুষের মতো মানুষ করে তুলতে হবে।

সেদিন স্কুল থেকে ফিরে সবে বাড়ির চৌকাঠে পা রেখেছে শেফালি, বাইরে থেকে শোনা যাচ্ছে তুতুলের কথা। বাবার সঙ্গে কথা বলছে সে। তুতুলের সঙ্গে একটু খুনসুঁটি করে বাবা মজা পায়, জানে শেফালি । একটা মাইনর অ্যাটাক এরমধ্যেই হয়ে গেছে বাবার। সবই তার চিন্তায় চিন্তায়। বোন রিমিলের সংসারে কোনও অশান্তি নেই। দিব্যি সংসার করছে সে। যত সমস্যা তার বেলা! বাবা আগে ঘুমের ট্যাবলেট খেত না। এখন রোজ খায়। মানে খেতে হয় আরকি। নইলে ঘুমই  আসবে না। মাকে প্রায়ই বলে, 'জানো, মেয়েটার মুখের দিকে তাকাতে পারি না, কান্না পায়। কি ছিল, কি হল মেয়েটার! কতদিন ওর হাসি মুখটা দেখিনি!' বাবা যে খুব চাপে আছে, বোঝে শেফালি। ডাক্তার বলেছেন, 'কোনও চাপ নেবেন না, দত্তবাবু। সবসময় হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করবেন।' শেফালি ভাবে, তুতুল না থাকলে বাবার যে কিভাবে সময় কাটতো ! 

দরজার পর্দা হাওয়ায় দুলছে। শেফালি সরালো না! দাঁড়িয়ে থাকলো পর্দার এপারে। যতদূর বুঝতে পারলো, বাবার নস্যির কৌটোটা জানলা দিয়ে বাইরে ফেলে দিয়েছে তুতুল। আর সেইজন্যেই বাবা ঠাট্টাচ্ছলে মা'কে বলছে ," কই গো, ওটাকে বের করে দাও তো ঘর থেকে। বদমাশটা আবার আজকে আমার নস্যির কোটোটা ফেলে দিয়েছে! '

অমনি তুতুলের উত্তর," আমাকে ঘর থেকে বের করে দিলে মা তো আর বাচ্চা পাবে না ! "

---"দরকার নেই আমাদের। আমরা বাজার থেকে কিনে নিয়ে আসবো।"

ঢোক গিলে গিলে ধীরে ধীরে তুতুল বলতে লাগলো' "বাজার থেকে? ওরা তো পুতুল! কথা বলতে পারবে না। মা'কে চুমুও খেতে পারবে না....।"

তুতুলের অস্ফুট কথাগুলো শুনে চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়তে লাগলো শেফালির। কোনওরকমে চোখটা মুছে পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকতে যাবে, অমনি তুতুল তাকে দেখে দৌড়ে এসে 'মা' 'মা' বলে জড়িয়ে ধরলো।

দড়ি তাকে ডাকলেও, তুতুলের এই ডাকটাকে উপেক্ষা করতে পারে না শেফালি। এই ডাকই তো তার বেঁচে থাকার অক্সিজেন! 

বাঁচার মতো বাঁচতে তো সে চেয়েই ছিল। কিন্তু বিন্নিপিসির কথা শুনে একটা ভুল সিদ্ধান্ত সেদিন নিয়ে ফেলেছিল বাবা। টাকা দিয়ে মেপে ছিলো জামাইকে, শেফালি যেটা চায়নি। তাকে প্রায় জোর করেই এই বিয়েতে রাজি করানো হয়েছিল। 

মাঝে মাঝে শেফালির মনে হয়, এও এক চক্রান্ত। 



------


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন