দেবুর সঙ্গে আমার ঝামেলাটা এখন মারাত্মক পর্যায়ে চলে গেছে।
দেবু আমার কলিগ। কিন্তু ওকে আমি আর এক মুহূর্ত সহ্য করতে পারছি না। সম্ভবত দেবুও আমাকে সহ্য করতে পারছে না। না পারারই কথা।
কেননা আমি 'চাকে ঢিল মেরেছি।' বেশ করেছি। আমার চোখের সামনে দিয়ে একটার পর একটা অন্যায় হয়ে যাবে, আর আমি মুখ বুঁজে সব দেখে যাবো! কক্ষনো না। আমি সেই বান্দাও নয়। নালিশ ঠুকে দিয়েছি একেবারে বিডিও-র কাছে।
বছরখানেক হল আমি এই অফিসে ট্রান্সফার নিয়ে এসেছি। তারজন্য আমাকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। কয়েকজনকে আবার 'মিষ্টিমুখ'ও করাতে হয়েছে। চাকরির প্রথমে পোস্টিং ছিলাম রায়গঞ্জ। ওখানে অন্য কোনও অসুবিধা আমার ছিল না। বরং ভালোই ছিলাম। উপরি পাওনাও ছিল বেশ। শুধু অসুবিধা ছিল বাড়ির থেকে দূরত্ব। দূরত্ব মানে প্রায় সাড়ে তিনশো কিলোমিটার।
ডেলি প্যাসেঞ্জারি তো সম্ভব ছিল না। তাই মাসে একবার বাড়িতে আসার চেষ্টা করতাম। কোনো কোনো মাসে সেটাও হয়ে উঠতো না। ছেলে তখন খুব ছোট। হাঁটাও শেখেনি। খুব কষ্ট হতো মিতালীর। তবু একা হাতে ঐ-ই সব সামলে নিতো। ওর কষ্টটা বুঝতাম। এসব জানতো দত্তদাও। আসলে আমিই বলতাম। রায়গঞ্জের অফিসে দত্তদা ছিল আমার কলিগ কাম প্রিয়জন। লোকাল লোক। খুব ভালোবাসতো আমাকে। আমার লোকাল গার্জেন বলা চলে। একদিন দত্তদা কথায় কথায় বললেন, 'দীপঙ্কর, বাড়ি থেকে দূরে থাকার কষ্টটা আমি বুঝি। একটা সময় আমিও দূরে ছিলাম। তা তুমি ট্রান্সফার নিচ্ছ না কেন?'
------ দাদা, যদি বাড়ির কাছে যেতে পারি তবে নিশ্চয় নেবো।
------ তারজন্য তুমি একবার হেড অফিসে যোগাযোগ করতে পারো!
------- আপনার চেনাজানা কেউ আছে?
------- আগে তো ছিল না। তবে এখন আছে।
তারপর দত্তদার কথামতো ওঁরই দূর সম্পর্কের আত্মীয় মুখার্জি সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। অমায়িক লোক। উনিই আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন বড়ো সাহেবের ঘরে। এরপর অনেক অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে, অবশেষে বাড়ির কাছে ট্রান্সফার নিয়ে এলাম। তাও পাক্কা ছ'বছর পরে।
বাড়ি থেকে এখন আমার অফিস যেতে বাইকে মাত্র পাঁচ মিনিট লাগে। এটুকু পথ হেঁটেও চলে আসা যায়। তবু সেকশন-অফিসার বলে কথা। তাছাড়া বাড়িতে বাইকটা পড়ে পড়ে নষ্টও হচ্ছিল। তাই ওটাকে কাজে লাগালাম।
অফিসে সবার সঙ্গেই আমার সদ্ভাব আছে। তবে দেবুর সঙ্গেই যেন আমার একটু বেশি সখ্য তৈরি হয়ে গেল! এ নিয়ে অনেকের চোখ টাঁটাতো। জানতাম। দেবুও জানতো। একদিন তো অফিসের পুরনো স্টাফ সঞ্জীব শূর কথায় কথায় বলেই ফেললেন, 'বাঃ, নতুন স্যারের সঙ্গে তো দেখছি দেবু স্যারের বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেছে!' আমি তখন শুধু মুচকি হেসে চুপ থেকেছি। কেননা আমি বিশ্বাস করি, কলিগ কখনো বন্ধু হতে পারে না। তবে অবশ্য দুই সম্পর্কে 'বন্ধুতা' খুঁজে পাওয়া যায়। যেমন রায়গঞ্জে ছিলেন দত্তদা। আমার লোকাল গার্জেন। তবে এখানে আমার লোকাল গার্জেনের ব্যাপার-স্যাপার নেই। কেননা আমার জন্মই এই শহরে। আমার লেখাপড়া ------স্কুল-কলেজ, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব, এক কথায় সবই এখানে।
কিছুদিন আগেও, আমাদের অফিসটাতে আমাকে আর দেবুকে পাশাপাশি বসে কাজ করতে দেখেছে লোকে। তাছাড়া কখনও বা অফিসের কাজে ওর বাইকে আমি, আমার বাইকে ও, একসঙ্গে গিয়েছি। কিন্তু সেসব দৃশ্য এখন অতীত। আমি সেসব কথা ভুলে যেতে চাই। দেবুও সম্ভবত সব ভুলে গিয়েছে। মানুষ চেনা অত সহজ নয়। সবকিছু বুঝে নিতে আমার একটু সময় লেগেছিল। এখানে এসে দেখলাম, দেবুর সায় ছাড়া কোনও ফাইল পাশ হয় না। অফিসের ইতিহাসে নাকি আগেও হয়নি। অন্তত দেবু জয়েন করার পর থেকে এখানে নাকি এই রীতিই চলে আসছে!
অফিসে দেবু আমার সিনিয়র হলেও বয়স কিংবা কাজের অভিজ্ঞতাতে আমি ওর সিনিয়র। তবে ওর প্লাস পয়েন্ট এই, শুরু থেকেই ও পোস্টিং এখানে। এক ডাকে সবাই চেনে ওকে। বিডিও, এসডিও, এমএলএ, এমনকি রুলিং পার্টির ছোট-বড় নেতার সঙ্গেও ওর দহরম-মহরম সম্পর্ক। প্রত্যেকের কন্টাক্ট নাম্বার ওর মোবাইলে সেভ করা। দেবুর সবচেয়ে বড়ো গুণ, কোন দেবতা কোন ফুলে তুষ্ট হয়, সেটা ও ভালো করেই জানে। আর এইজন্যই দেবুকে সবাই খাতির করে চলে। তাই দেবু লোকাল ছেলে নাহলেও এখানে জাঁকিয়ে বসতে ওর কোনও অসুবিধা হয়নি। বহাল তবিয়তে আছে। ছোটমোটো, যেকোনো কাজে পাব্লিক এসে আগে ওর খোঁজ করে। অথচ আমি ও দেবু একই পোস্টে আছি!
যাইহোক, বাঁ-হাতের ইনকাম যে দেবুর বেশ ভালোই, সেটা ওর বাড়ি দেখলেই বোঝা যায়। কেননা একবার আমাকে দেবু নিয়ে গিয়েছিল ওর বাড়িতে। মার্বেল বসানো তিন তলা বাড়িটাকে আমার তো ছোটখাটো একটা প্রাসাদ মনে হয়েছিল! আর ওর গলার সোনার চেনটার কথা নাইবা বললাম।
আমার আর দেবুর ব্যাপারটা বাড়িতেও ইতিমধ্যে জানাজানি হয়েছে। আসলে আমিই বলেছি মিতালীকে। বাধ্য হয়ে। না বলে উপায়ও ছিল না। আমি মানসিক অশান্তিতে থাকলে, কেমন করে জানি মিতালী সব জেনে যায়! বিয়ের পর থেকে বহুবার হয়েছে এমনটা। লাস্ট যেদিন দেবুর সঙ্গে বেশ বড় রকমের কথা কাটাকাটি হল, আমাকে ও 'দেখে' নেওয়ার হুমকি দিল, সেদিন অফিস থেকে বাড়ি ফিরে সবে সোফায় বসেছি, অমনি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে মিতালী বললো, 'কী হয়েছে?'
------ কই?
----- মুখ কালো করে বসে আছো!
------ কই মুখ কালো?
------ কই মানে! কী হয়েছে, বলো?
------ বলছি তো কিছু না।
------ কিছু না? তুমি হা করলেই আমি হাওড়া বুঝে যায়। বলো কী হয়েছে?
ওর কথা শুনে হেসে ফেললাম। বললাম, 'হ্যাঁ, তুমি তো সবজান্তা।'
------ হ্যাঁ, আমি সবজান্তা। বলো।
নাছোড় মিতালীকে অবশেষে সব খুলে বললাম। ও দেবুকে চেনে। বারকয়েক আমাদের বাড়িতে এসেছে ও।
সব শুনে মিতালী বললো, 'বাঃ, তুমি সম্পর্ক তৈরি করতে যেমন ওস্তাদ, দেখছি ভাঙতেও তেমন ওস্তাদ। এই কিছুদিন আগে তোমার মুখ থেকেই শুনেছি, দেবুর মতো নাকি ছেলেই হয় না! ও খুব ভালো লোক। আর আজ তুমিই কি-না বলছো, ওর মতো খারাপ লোক পৃথিবীতেই নেই!'
------ হ্যাঁ বলছি। ঠিকই বলছি, মিতালী। ওর মতো হারামি আমি আর একটাও দেখিনি। চায়লে ও মানুষ পর্যন্ত খুন করতে পারে, জানো!
------ না, আমার জানার দরকার নেই। তুমিই জানো। জলে থেকে কুমিরের সঙ্গে কেউ লড়াই করে না। ও কি তোমাকে ছেড়ে দেবে ভেবেছো? তুমিই তো বলেছিলে, ওর শ্বশুরের নাকি মন্ত্রী লেবেলে জানাশোনা। আবার রুলিং পার্টির মেম্বার। এবার ঠ্যালা সামলাও। ট্রান্সফার এই হলে বলে।
------ যা হবার, তাই হবে। অতশত ভাবি না।
------- না, তুমি ভাববে কেন? ভাববো তো আমি! বুবাইকে সবেমাত্র নতুন একটা স্কুলে ভর্তি করানো হল। আর এখন ট্রান্সফার হলে ওর পড়াশোনাটা তো লাটে উঠবে!
------ তা কেন! যদি ট্রান্সফার হই, তোমাদের কোত্থাও যেতে হবে না। বুবাই এই স্কুলেই পড়বে। তোমরা এখানেই থাকবে।
------- ও, আবার তুমি সেই মেস করে থাকবে! বাড়ি থেকে খেয়ে অফিস যাচ্ছ, দরকার পড়লে বাড়ি চলে আসতে পারছো, এসব ভালো লাগছে না, না? ভূতে কিলোচ্চছে?
------- বাড়ির কাছে থাকবো বলে কি আমাকে সবকিছু মাথা পেতে সহ্য করে নিতে হবে?
------- হবে। তোমার মতো ঐ অফিসে আরও অনেকে আছে। তারা যদি মানিয়ে নিতে পারে, তবে তোমার অসুবিধাটা কোথায়? তুমি কোন হরিদাস পাল? তুমি এখানে ট্রান্সফার নিয়ে এসেছো বছরখানেকও হয়নি। আবার এরমধ্যেই যদি ট্রান্সফার হও, লোকে কি বলবে?
------ লোকে কি বলবে, তা নিয়ে আমার ভেবে কাজ নেই। ওটা লোকেই ভাবুক।
------ ও, তাই না-কি! তবে বাড়ির কাছে এলে কি জন্যে? পরিবারের সঙ্গে যদি না থাকতে চাও, তাহলে তো তোমার রায়গঞ্জে থাকাই ভালো ছিল।
আমি চুপ মেরে গেলাম। আর কথা বাড়ায়নি।
।।২।।
মিতালী যা আশঙ্কা করেছিল, ঠিক তাই। আজ অফিসে টিফিন আওয়ারে বসে ছিলাম আমার টেবিলে। পাশের ঘরের দিলীপবাবু এসে বললেন, 'দীপঙ্কর, তোমাকে মনে হয় ফোর্স ট্রান্সফার করছে উপর মহল থেকে, শুনেছো?'
------ না তো! আপনি জানলেন কী করে?
------ আমি কানাঘুষো শুনছিলাম। বিডিও অফিস গিয়েছিলাম। ওখান থেকেই খবরটা পেলাম।
------ মেইল-টেইল এসেছে নাকি?
------ এসেছে মনে হয়।
------- আচ্ছা। তবে আমাকে এখনও অফিসিয়ালি কিছু বলা হয়নি।
দিলীপদা শুধু বললেন, 'ওর সঙ্গে এতটা ঝামেলায় না জড়িয়ে গেলেই মনে হয় ভালো হতো।'
'ওর' বলতে যে দেবুর কথা বলছেন, তা আর বুঝতে বাকি থাকলো না। আমি কথা বাড়ালাম না। একটা শুষ্ক হাসি দিয়ে আলুপোস্ত দিয়ে রুটি চিবোতে লাগলাম।
বাড়িতে এসে বউকে বললাম, 'একটু কড়া করে চা করো তো, মিতালী। পারলে একটু আদা দিও।' আমার কথা শেষ হতেই মিতালী দেখলাম রান্নাঘরে চলে গেল। কেননা সেদিনের পর থেকে মিতালী যতটুকু প্রয়োজন, তার বেশি আর কথা বলছিল না।
আমি একটা তোয়ালে টেনে বাথরুমে ঢুকে গেলাম। হাতমুখ ধুয়ে এসে আলমারি থেকে সব ফাইলপত্র নিয়ে বসলাম। কাগজপত্র সব ঠিকঠাক আছে কি-না একবার দেখে নিতে হবে। নইলে নতুন জায়গায় বেশ সমস্যায় পড়তে হতে পারে। এই অফিসেই তো হয়েছিল অ্যাপ্রুভালের সময়। কি একটা কাগজ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। সম্ভবত এল.পি.সি। তাই সব কাগজ গুছিয়ে রাখতে হবে। তার আগে একটু চায়ে চুমুক দিতে পারলে শান্তি!
বুবাই সোফায় বসেছিল। সারাদিনে সে কী কী করেছে জানতে চেয়ে, ওকে কোলে তুলে নিয়ে একটু আদর করছিলাম। এরমধ্যেই মিতালী চা-এর ট্রে নিয়ে হাজির। ট্রে থেকে কাপটা তুলে নিয়ে চায়ে একটা চুমুক দিয়ে বললাম, 'বাঃ!, চা'টা বেশ ভালো করেছো তো।'
মিতালী মুচকি হাসলো। বুবাইয়ের জন্য একটা ক্যাডবেরির প্যাকেট এনেছিলাম। ওটা নিয়ে ও পাশের ঘরে চলে গেলো। ছেলে চলে যেতেই মিতালীকে আমার ট্রান্সফারের বিষয়টা জানালাম। শুনেই তো প্রায় আঁতকে উঠল ও। তারপর মুখ ঝামটা দিয়ে বললো, ' হলো তো, এবার বোঝ! সব তাতে তোমার বেশি বেশি।' আর কিচ্ছু বললো না। চুপ করে গেলো।
আমিও কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে দাঁত বার করে হাসতে হাসতে বললাম, 'আমি চাচ্ছিলাম, বুঝলে? আমিই চাচ্ছিলাম, উপর মহলে কলকাঠি নেড়ে অন্তত দেবু আমার ট্রান্সফারটা করে দিক। জানতাম, দেবুর সেই এলেম আছে। সেজন্যই ওকে আমি আর ইদানিং 'সহ্য' করতে পারছিলাম না। কেন জানো? বাড়ির কাছে এসে সত্যিই আমার এক্সট্রা কোনও ইনকাম হচ্ছিল না, মিতালী। যেটা রায়গঞ্জে ছিল। এবার দেখো, প্রতি বছর তোমার আবার একটা করে গয়না হবে। সত্যিই বলছি, দেবু খুব ভালো লোক।'
--------------------
