রবিবার, ২৯ জুন, ২০২৫

সুজয় চক্রবর্তীর গল্প : ভালো লোক, খারাপ লোক



দেবুর সঙ্গে আমার ঝামেলাটা এখন মারাত্মক পর্যায়ে চলে গেছে। 

দেবু আমার কলিগ। কিন্তু ওকে আমি আর এক মুহূর্ত সহ্য করতে পারছি না। সম্ভবত দেবুও আমাকে সহ্য করতে পারছে না। না পারারই কথা।


কেননা আমি 'চাকে ঢিল মেরেছি।' বেশ করেছি। আমার চোখের সামনে দিয়ে একটার পর একটা অন্যায় হয়ে যাবে, আর আমি মুখ বুঁজে সব দেখে যাবো! কক্ষনো না। আমি সেই বান্দাও নয়। নালিশ ঠুকে দিয়েছি একেবারে বিডিও-র কাছে।

বছরখানেক হল আমি এই অফিসে ট্রান্সফার নিয়ে এসেছি। তারজন্য আমাকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। কয়েকজনকে আবার 'মিষ্টিমুখ'ও করাতে হয়েছে। চাকরির প্রথমে পোস্টিং ছিলাম রায়গঞ্জ। ওখানে অন্য কোনও অসুবিধা আমার ছিল না। বরং ভালোই ছিলাম। উপরি পাওনাও ছিল বেশ। শুধু অসুবিধা ছিল বাড়ির থেকে দূরত্ব। দূরত্ব মানে প্রায় সাড়ে তিনশো কিলোমিটার।


ডেলি প্যাসেঞ্জারি তো সম্ভব ছিল না। তাই মাসে একবার বাড়িতে আসার চেষ্টা করতাম। কোনো কোনো মাসে সেটাও হয়ে উঠতো না। ছেলে তখন খুব ছোট। হাঁটাও শেখেনি। খুব কষ্ট হতো মিতালীর। তবু একা হাতে ঐ-ই সব সামলে নিতো। ওর কষ্টটা বুঝতাম। এসব জানতো দত্তদাও। আসলে আমিই বলতাম। রায়গঞ্জের অফিসে দত্তদা ছিল আমার কলিগ কাম প্রিয়জন। লোকাল লোক। খুব ভালোবাসতো আমাকে। আমার লোকাল গার্জেন বলা চলে। একদিন দত্তদা কথায় কথায় বললেন, 'দীপঙ্কর, বাড়ি থেকে দূরে থাকার কষ্টটা আমি বুঝি। একটা সময় আমিও দূরে ছিলাম। তা তুমি ট্রান্সফার নিচ্ছ না কেন?'

------ দাদা, যদি বাড়ির কাছে যেতে পারি তবে নিশ্চয় নেবো।

------ তারজন্য তুমি একবার হেড অফিসে যোগাযোগ করতে পারো! 

------- আপনার চেনাজানা কেউ আছে? 

------- আগে তো ছিল না। তবে এখন আছে।

তারপর দত্তদার কথামতো ওঁরই দূর সম্পর্কের আত্মীয় মুখার্জি সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। অমায়িক লোক। উনিই আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন বড়ো সাহেবের ঘরে। এরপর অনেক অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে, অবশেষে বাড়ির কাছে ট্রান্সফার নিয়ে এলাম। তাও পাক্কা ছ'বছর পরে। 

বাড়ি থেকে এখন আমার অফিস যেতে বাইকে মাত্র পাঁচ মিনিট লাগে। এটুকু পথ হেঁটেও চলে আসা যায়। তবু সেকশন-অফিসার বলে কথা। তাছাড়া বাড়িতে বাইকটা পড়ে পড়ে নষ্টও হচ্ছিল। তাই ওটাকে কাজে লাগালাম। 

অফিসে সবার সঙ্গেই আমার সদ্ভাব আছে। তবে দেবুর সঙ্গেই যেন আমার একটু বেশি সখ্য তৈরি হয়ে গেল! এ নিয়ে অনেকের চোখ টাঁটাতো। জানতাম। দেবুও জানতো। একদিন তো অফিসের পুরনো স্টাফ সঞ্জীব শূর কথায় কথায় বলেই ফেললেন, 'বাঃ, নতুন স্যারের সঙ্গে তো দেখছি দেবু স্যারের বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেছে!' আমি তখন শুধু মুচকি হেসে চুপ থেকেছি। কেননা আমি বিশ্বাস করি, কলিগ কখনো বন্ধু হতে পারে না। তবে অবশ্য দুই সম্পর্কে 'বন্ধুতা' খুঁজে পাওয়া যায়। যেমন রায়গঞ্জে ছিলেন দত্তদা। আমার লোকাল গার্জেন। তবে এখানে আমার লোকাল গার্জেনের ব্যাপার-স্যাপার নেই। কেননা আমার জন্মই এই শহরে। আমার লেখাপড়া ------স্কুল-কলেজ, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধুবান্ধব, এক কথায় সবই এখানে। 

কিছুদিন আগেও, আমাদের অফিসটাতে আমাকে আর দেবুকে পাশাপাশি বসে কাজ করতে দেখেছে লোকে। তাছাড়া কখনও বা অফিসের কাজে ওর বাইকে আমি, আমার বাইকে ও, একসঙ্গে গিয়েছি। কিন্তু সেসব দৃশ্য এখন অতীত। আমি সেসব কথা ভুলে যেতে চাই। দেবুও সম্ভবত সব ভুলে গিয়েছে। মানুষ চেনা অত সহজ নয়। সবকিছু বুঝে নিতে আমার একটু সময় লেগেছিল। এখানে এসে দেখলাম, দেবুর সায় ছাড়া কোনও ফাইল পাশ হয় না। অফিসের ইতিহাসে নাকি আগেও হয়নি। অন্তত দেবু জয়েন করার পর থেকে এখানে নাকি এই রীতিই চলে আসছে! 

অফিসে দেবু আমার সিনিয়র হলেও বয়স কিংবা কাজের অভিজ্ঞতাতে আমি ওর সিনিয়র। তবে ওর প্লাস পয়েন্ট এই, শুরু থেকেই ও পোস্টিং এখানে। এক ডাকে সবাই চেনে ওকে। বিডিও, এসডিও, এমএলএ, এমনকি রুলিং পার্টির ছোট-বড় নেতার সঙ্গেও ওর দহরম-মহরম সম্পর্ক। প্রত্যেকের কন্টাক্ট নাম্বার ওর মোবাইলে সেভ করা। দেবুর সবচেয়ে বড়ো গুণ, কোন দেবতা কোন ফুলে তুষ্ট হয়, সেটা ও ভালো করেই জানে। আর এইজন্যই দেবুকে সবাই খাতির করে চলে। তাই দেবু লোকাল ছেলে নাহলেও এখানে জাঁকিয়ে বসতে ওর কোনও অসুবিধা হয়নি। বহাল তবিয়তে আছে। ছোটমোটো, যেকোনো কাজে পাব্লিক এসে আগে ওর খোঁজ করে। অথচ আমি ও দেবু একই পোস্টে আছি! 

যাইহোক, বাঁ-হাতের ইনকাম যে দেবুর বেশ ভালোই, সেটা ওর বাড়ি দেখলেই বোঝা যায়। কেননা একবার আমাকে দেবু নিয়ে গিয়েছিল ওর বাড়িতে। মার্বেল বসানো তিন তলা বাড়িটাকে আমার তো ছোটখাটো একটা প্রাসাদ মনে হয়েছিল! আর ওর গলার সোনার চেনটার কথা নাইবা বললাম।

আমার আর দেবুর ব্যাপারটা বাড়িতেও ইতিমধ্যে জানাজানি হয়েছে। আসলে আমিই বলেছি মিতালীকে। বাধ্য হয়ে। না বলে উপায়ও ছিল না। আমি মানসিক অশান্তিতে থাকলে, কেমন করে জানি মিতালী সব জেনে যায়! বিয়ের পর থেকে বহুবার হয়েছে এমনটা। লাস্ট যেদিন দেবুর সঙ্গে বেশ বড় রকমের কথা কাটাকাটি হল, আমাকে ও 'দেখে' নেওয়ার হুমকি দিল, সেদিন অফিস থেকে বাড়ি ফিরে সবে সোফায় বসেছি, অমনি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে  মিতালী বললো, 'কী হয়েছে?'

------ কই? 

----- মুখ কালো করে বসে আছো!

------ কই মুখ কালো? 

------ কই মানে! কী হয়েছে, বলো?

------ বলছি তো কিছু না।

------ কিছু না? তুমি হা করলেই আমি হাওড়া বুঝে যায়। বলো কী হয়েছে? 

ওর কথা শুনে হেসে ফেললাম। বললাম, 'হ্যাঁ, তুমি তো সবজান্তা।'

------ হ্যাঁ, আমি সবজান্তা। বলো।

নাছোড় মিতালীকে অবশেষে সব খুলে বললাম। ও দেবুকে চেনে। বারকয়েক আমাদের বাড়িতে এসেছে ও। 

সব শুনে মিতালী বললো, 'বাঃ, তুমি সম্পর্ক তৈরি করতে যেমন ওস্তাদ, দেখছি ভাঙতেও তেমন ওস্তাদ। এই কিছুদিন আগে তোমার মুখ থেকেই শুনেছি, দেবুর মতো নাকি ছেলেই হয় না! ও খুব ভালো লোক। আর আজ তুমিই কি-না বলছো, ওর মতো খারাপ লোক পৃথিবীতেই নেই!'

------ হ্যাঁ বলছি। ঠিকই বলছি, মিতালী। ওর মতো হারামি আমি আর একটাও দেখিনি। চায়লে ও মানুষ পর্যন্ত খুন করতে পারে, জানো! 

------ না, আমার জানার দরকার নেই। তুমিই জানো। জলে থেকে কুমিরের সঙ্গে কেউ লড়াই করে না। ও কি তোমাকে ছেড়ে দেবে ভেবেছো? তুমিই তো বলেছিলে, ওর শ্বশুরের নাকি মন্ত্রী লেবেলে জানাশোনা। আবার রুলিং পার্টির মেম্বার। এবার ঠ্যালা সামলাও। ট্রান্সফার এই হলে বলে।

------ যা হবার, তাই হবে। অতশত ভাবি না।

------- না, তুমি ভাববে কেন? ভাববো তো আমি! বুবাইকে সবেমাত্র নতুন একটা স্কুলে ভর্তি করানো হল। আর এখন ট্রান্সফার হলে ওর পড়াশোনাটা তো লাটে উঠবে! 

------ তা কেন! যদি ট্রান্সফার হই, তোমাদের কোত্থাও যেতে হবে না। বুবাই এই স্কুলেই পড়বে। তোমরা এখানেই থাকবে। 

------- ও, আবার তুমি সেই মেস করে থাকবে! বাড়ি থেকে খেয়ে অফিস যাচ্ছ, দরকার পড়লে বাড়ি চলে আসতে পারছো, এসব ভালো লাগছে না, না? ভূতে কিলোচ্চছে?

------- বাড়ির কাছে থাকবো বলে কি আমাকে সবকিছু মাথা পেতে সহ্য করে নিতে হবে? 

------- হবে। তোমার মতো ঐ অফিসে আরও অনেকে আছে। তারা যদি মানিয়ে নিতে পারে, তবে তোমার অসুবিধাটা কোথায়? তুমি কোন হরিদাস পাল? তুমি এখানে ট্রান্সফার নিয়ে এসেছো বছরখানেকও হয়নি। আবার এরমধ্যেই যদি ট্রান্সফার হও, লোকে কি বলবে? 

------ লোকে কি বলবে, তা নিয়ে আমার ভেবে কাজ নেই। ওটা লোকেই ভাবুক।

------ ও, তাই না-কি! তবে বাড়ির কাছে এলে কি জন্যে? পরিবারের সঙ্গে যদি না থাকতে চাও, তাহলে তো তোমার রায়গঞ্জে থাকাই ভালো ছিল। 

আমি চুপ মেরে গেলাম। আর কথা বাড়ায়নি। 


।।২।।

মিতালী যা আশঙ্কা করেছিল, ঠিক তাই। আজ অফিসে টিফিন আওয়ারে বসে ছিলাম আমার টেবিলে। পাশের ঘরের দিলীপবাবু এসে বললেন, 'দীপঙ্কর, তোমাকে মনে হয় ফোর্স ট্রান্সফার করছে উপর মহল থেকে, শুনেছো?'

------ না তো! আপনি জানলেন কী করে? 

------ আমি কানাঘুষো শুনছিলাম। বিডিও অফিস গিয়েছিলাম। ওখান থেকেই খবরটা পেলাম।

------ মেইল-টেইল এসেছে নাকি? 

------ এসেছে মনে হয়।

------- আচ্ছা। তবে আমাকে এখনও অফিসিয়ালি কিছু বলা হয়নি।

দিলীপদা শুধু বললেন, 'ওর সঙ্গে এতটা ঝামেলায় না জড়িয়ে গেলেই মনে হয় ভালো হতো।'

'ওর' বলতে যে দেবুর কথা বলছেন, তা আর বুঝতে বাকি থাকলো না। আমি কথা বাড়ালাম না। একটা শুষ্ক হাসি দিয়ে আলুপোস্ত দিয়ে রুটি চিবোতে লাগলাম।

বাড়িতে এসে বউকে বললাম, 'একটু কড়া করে চা করো তো, মিতালী। পারলে একটু আদা দিও।' আমার কথা শেষ হতেই মিতালী দেখলাম রান্নাঘরে চলে গেল। কেননা সেদিনের পর থেকে মিতালী যতটুকু প্রয়োজন,  তার বেশি আর কথা বলছিল না। 

আমি একটা তোয়ালে টেনে বাথরুমে ঢুকে গেলাম। হাতমুখ ধুয়ে এসে আলমারি থেকে সব ফাইলপত্র নিয়ে বসলাম। কাগজপত্র সব ঠিকঠাক আছে কি-না একবার দেখে নিতে হবে। নইলে নতুন জায়গায় বেশ সমস্যায় পড়তে হতে পারে। এই অফিসেই তো হয়েছিল অ্যাপ্রুভালের সময়। কি একটা কাগজ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। সম্ভবত এল.পি.সি। তাই সব কাগজ গুছিয়ে রাখতে হবে। তার আগে একটু চায়ে চুমুক দিতে পারলে শান্তি! 

বুবাই সোফায় বসেছিল। সারাদিনে সে কী কী করেছে জানতে চেয়ে, ওকে কোলে তুলে নিয়ে একটু আদর করছিলাম। এরমধ্যেই মিতালী চা-এর ট্রে নিয়ে হাজির। ট্রে থেকে কাপটা তুলে নিয়ে চায়ে একটা চুমুক দিয়ে বললাম, 'বাঃ!, চা'টা বেশ ভালো করেছো তো।' 

মিতালী মুচকি হাসলো। বুবাইয়ের জন্য একটা ক্যাডবেরির প্যাকেট এনেছিলাম। ওটা নিয়ে ও পাশের ঘরে চলে গেলো। ছেলে চলে যেতেই মিতালীকে আমার ট্রান্সফারের বিষয়টা জানালাম। শুনেই তো প্রায় আঁতকে উঠল ও। তারপর মুখ ঝামটা দিয়ে বললো, ' হলো তো, এবার বোঝ! সব তাতে তোমার বেশি বেশি।' আর কিচ্ছু বললো না। চুপ করে গেলো। 

আমিও কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে দাঁত বার করে হাসতে হাসতে বললাম, 'আমি চাচ্ছিলাম, বুঝলে? আমিই চাচ্ছিলাম, উপর মহলে কলকাঠি নেড়ে অন্তত দেবু আমার ট্রান্সফারটা করে দিক। জানতাম, দেবুর সেই এলেম আছে। সেজন্যই ওকে আমি আর ইদানিং 'সহ্য' করতে পারছিলাম না। কেন জানো? বাড়ির কাছে এসে সত্যিই আমার এক্সট্রা কোনও ইনকাম হচ্ছিল না, মিতালী। যেটা রায়গঞ্জে ছিল। এবার দেখো, প্রতি বছর তোমার আবার একটা করে গয়না হবে। সত্যিই বলছি, দেবু খুব ভালো লোক।'




--------------------


সুজয় চক্রবর্তীর গল্প : বছর দশ পর


ঝিনুককে দরজা বন্ধ করতে দেখেই বুকের ভেতরটা ছ্যাক করে উঠলো শুভেন্দুবাবুর। রাগের মাথায় মানুষ কখন যে কি ক'রে বসে!
----- বড়ো বউমা, দরজা খোলো। দরজা খোলো, মা। এমন ছেলেমানুষি ক'রো না। 
সজোরে দরজা ধাক্কাতে লাগলেন শুভেন্দুবাবু। দাদুকে ওভাবে দরজা ধাক্কাতে দেখে ভয়ে বড়ো বড়ো চোখ করে তাকিয়ে আছে তপাই। শুভেন্দুর তিন বছরের নাতি। স্পষ্ট করে কথা বলতে পারে না এখনও। 
----- মা দলজা খুলতে না কেন দাদান্ ?
----- তুমি একবার ডাকো দাদুভাই, মা ঠিক দরজা খুলবে।
ছোট্ট দুটো হাত দিয়ে দরজায় ধাক্কা দিতে লাগলো তপাই। 
----- মা, দলজা খোলো। মা, দলজা খোলো। 
মা দরজা খুলছে না দেখে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলো সে। 
দু'হাত দূরেই সোফায় বসে আছে কমল। না শোনার ভান করে মোবাইলে গেম খেলে চলেছে। নাতিকে কোলে তোলার বৃথা চেষ্টা করে যাচ্ছেন শুভেন্দু। তার কান্না থামছে না কিছুতেই। 
দরজা ভেজানোই ছিল। মুদির বাজার করে ঘরে ঢুকলো সবিতা। কাজের মেয়ে। তপাইকে ওভাবে কাঁদতে দেখে একপ্রকার জোর করেই কোলে তুলে নিল তাকে। কিন্তু থামলো তো না-ই, তপাইয়ের কান্না দ্বিগুণ গেল বেড়ে। 
ওদিকে ঘর বন্ধ করে ঝিনুক সমানে বালিশে মুখ গুঁজে শুধু কেঁদে চলেছে। শেষে কি না গায়ে হাত দিলো কমল! কি হবে এই তাচ্ছিল্যের জীবনটা রেখে! জীবনটা শেষ করে দিতে হাতের কাছে সবকিছুই মজুত। বদ্ধ ঘরে কেউ বাধাও দেবে না! কিন্তু দরজার বাইরে শুধু তার জন্যই এক নাগারে কেঁদে চলেছে তপাই ----- তারই রক্ত, মাংস, দিয়ে গড়া এক অবোধ শিশু। সে চলে গেলে তপাইকে কোলেপিঠে করে কে  মানুষ করবে ? নাড়ি ছিন্ন করে তাকে যে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছিল সে-ই। দায় তো তাই তারই! কেননা এক অকালকুষ্মাণ্ড যদি হয় তার জন্মদাতা পিতা, তার তো প্রতি পদে পদে বিপদ! হঠাৎ ডেসিন টেবিলের আয়নায় চোখ পড়লো ঝিনুকের। আয়নার ঝিনুক যেন তাকে বলছে, ' দরজা খোলো ঝিনুক। তপাই কাঁদছে।'
দরজা খুললো ঝিনুক। তপাইকে সবিতার কোল থেকে নিজের কোলে নিয়ে নি:শব্দে কেঁদে ফেললো সে। শুভেন্দুবাবু তার পিঠে হাত রাখলেন। 
বসার ঘরে সোফার উপরে মাথা নিচু করে তখনও বসে আছে কমল। হাতে মোবাইল। ঝিনুককে বেরোতে দেখে একবার তাকালোও। শুভেন্দুবাবু কমলের দিকে তাকিয়ে বিরক্তির সঙ্গে বললেন, ' ছি!  বড়ো খোকা, ছি! তোকে যে কি বলবো, ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না!'
ঘাড় নাড়তে নাড়তে তিনি নিজের ঘরের দিকে চলে গেলেন। মাথা তুলে বাবার চলে যাওয়ার দিকে তাকালো কমল। তারপর বাইকের চাবিটা নিয়ে সোজা বাইরে বেরিয়ে গেল সে।
এই গম্ভীর পরিবেশে সবিতা রান্না ঘরে যাওয়ার সাহসও পাচ্ছে না। এদিকে বেলা বয়ে যাচ্ছে।
ঝিনুক এখন চোখের জল মুছে তপাইকে স্নান করানোর তোরজোড় করছে। মুখে কোনও কথা নেই তার। আজ দিনটা অন্যরকম। দিন পনেরো আগেই সেটা হতে পারতো। ঝিনুক তা চায়নি। সময়। সময় দিয়েছিল কমলকে। যাতে আর কোনও দিনই সে বর্ণালীর ছায়া না মাড়ায়। গত রাতেও তো এই নিয়ে একচোট হয়ে গিয়েছে। আর আজ সকালে বর্ণালীর ফোনটা আসার পরেই এই গণ্ডগোল।
(২)
----- কে এই বর্ণালী, রজতদা?
সম্পর্ক উর্বর হলে পরও কখন আপন হয়ে যায়। রজতকে দাদা বলেই ডাকে ঝিনুক। রজত কমলের কলিগ। নিজের বোনের মতো ভালোবাসে ঝিনুককে। 
----- বর্ণালী আমাদের সেকশনে নতুন জয়েন করেছে। মেয়েটি এমনি মিশুকে। আনম্যারেড। বাবার একটাই মেয়ে। বাড়ির অবস্থা ভালো।
----- কিন্তু কিভাবে ব্যাপারটা....
----- ওরা প্রায়ই অফিস শেষে একসঙ্গে ঘুরতে বেরোয়, এরকম কানাঘুষো শুনেছি। তবে সেদিন যেটা ঘটেছে...  আর বসে থাকতে পারলাম না, তাই ছুটে এলাম। 
----- কি এমন ঘটলো রজতদা...
----- আমাদের স্টাফ পুলককে তো তুমি চেনো?
---- হ্যাঁ, একবার দেখেওছি রাতুল চৌধুরীর মেয়ের বিয়েতে।
-----  সেদিন প্রায় সবাই-ই ছুটির পর অফিস থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলাম। ছিল শুধু কমল, বর্ণালী, গ্রুপ ডি স্টাফ দুজন আর পুলক। পুলকের মুখের কথায় আমি বিশ্বাস করিনি। যখন মোবাইলে সেই ছবি দেখালো, আমি আকাশ থেকে পড়লাম! কমল কি না  বর্ণালীর কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে, আর বর্ণালী বিলি কাটছে মাথায়!....  জানি তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে শুনতে। কিন্তু মনে হল তোমাকে ঘটনাটা জানানো দরকার। এখনও সময় আছে, কমলকে ও পথ থেকে সরাও। 
রাতে খাওয়াদাওয়া হয়ে গেলে যে দুয়েকটা কথা হয়েছিল ঝিনুক আর কমলের মধ্যে, তা এইরকম : 
---- বর্ণালী কে?
---- রজত এসেছিলো?
---- আমার প্রশ্নের উত্তর পাইনি।
---- ঐ তো বললাম। রজত এসেছিলো নিশ্চয়! ঐ-ই তো সব বলে গেছে। আবার আমাকে জিজ্ঞাসা কেন, বর্ণালী কে?
---- ওর সঙ্গে তোমার কী সম্পর্ক?
---- আর পাঁচটা কলিগের সঙ্গে যেমন...
---- বাজে কথা রাখো। আমি কি বলতে চাইছি, আশাকরি বুঝতে পারছো?
---- কী বলতে চাইছো?
---- স্বাদ বদল করছো?
---- আমার ঘুম পাচ্ছে। এই রাত দুপুরে চেল্লামেল্লি করতে ভালো লাগছে না। 
---- তাই! আচ্ছা, আমাদের কি প্রেম করে বিয়ে হয়েছিলো? 
---- আঃ, একটু ঘুমোতে দেবে?
---- ঘুম? আমার ঘুম কেড়ে নিয়ে তুমি ঘুমোবে?
---- চিল্লিও না। পাশের ঘরে বাবা আছে। তপাই জেগে উঠবে।
---- বাঃ, কতো ভাবো তুমি! কতো ভাবো! এই ভাবনাটাই আগে হয়নি কেন? আমার কথা ভেবেছিলে? ভাবোনি।....  যাক, একটা কথা বলে রাখলাম, দ্বিতীয়বার যেন বর্ণালীকে নিয়ে তোমার নামে কোনও কথা না শুনি। 
(৩)
সেই রাতের পর থেকে বর্ণালীর কোনও নামগন্ধ শোনা যায়নি কমলদের বাড়িতে। অনেকদিন। কিন্তু আজ সকালে একটা আননোন নম্বর থেকে ফোন এসেছিলো কমলের মোবাইলে। কমল তখন টয়লেটে।
---- হ্যালো কে? 
---- আমি বর্ণালী বলছি। কমলদা নেই?
---- বর্ণালী?  না, এটা রঙ নম্বর। ফোনটা কেটে দিয়েছিলো ঝিনুক। এর ঠিক পাঁচ মিনিট পরে আবার ফোন এসেছিলো। সেম নম্বর। ফোনটা ধরে চুপ করেছিলো ঝিনুক। 
---- হ্যালো, ফোনটা কাটছেন কেন, এটা কমলদারই নম্বর।
---- হ্যাঁ, কমলদার নম্বর। কি দরকার বলো।
---- সেটা কমলদাকেই বলবো।
মাথাটা হঠাৎ গরম হয়ে গিয়েছিল  ঝিনুকের। আর সামলাতে পারেনি।
---- বেহায়া কোথাকার! আর কোনও দিনও যদি তুমি এই নম্বরে ফোন করেছো...ফোনটা কেটে দেয় ঝিনুক।
এরমধ্যেই কখন যে কমল তার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে, তা টের পায়নি সে। ঝিনুকের হাত থেকে মোবাইলটা এক প্রকার ছিনিয়ে নিয়ে একটা চড় কষিয়ে দিলো কমল। এই প্রথম। দশ বছরের বিবাহিত জীবনে এই প্রথম ঝিনুকের গায়ে হাত তুললো কমল। 
(৪)
তপাইকে স্নান করানো হয়ে গেছে। ও এখন ব্যালকনিতে দাদুর সঙ্গে গল্প জুড়েছে। সবিতা রান্নাঘরে। সবকিছু আন্দাজ করে ঝিনুককে আর ঘাটায়নি সে। ঝিনুক এখন বেডরুমে ঠাইঁ বসে। 
এ ঘটনা কার সঙ্গে শেয়ার করবে ঝিনুক? মা'র সঙ্গে? মা'র বয়স হয়েছে। চিন্তা করবে। তবে কাকে বলা যায়, যাতে একটু হলেও হাল্কা হতে পারে ঝিনুক। কেয়াকে কি ফোন করা যায়! ও তো ঝিনুকের পুতুল-বেলার বন্ধু। ও তো বুঝবে ওর ব্যাপারটা। স্কুলে থাকতে কতো কথা তো শেয়ার করেছে কেয়াকে! 
অনেকদিন ফোনাফোনি হয়নি দুজনের। নম্বরটা ডায়াল করতেই সেই চিকন গলা, বাব্বা, তুই তো একদম ভুলেই গেছিস!
----- ভুললে কি আর ফোন করতাম?
---- যাক্, কেমন আছিস বল্।
---- তুই কেমন আছিস বল্।
ঝিনুকের কথার উত্তরে এক মুহূর্ত না থেমে কেয়া বললো, বিন্দাস! খাচ্ছি দাচ্ছি, ঘুরে বেরাচ্ছি, বরের পকেট কাটছি আর বাচ্চা সামলাচ্ছি।
----বাঃ, খুব ভালো! বরের পকেটও কাটছিস?
---- কি করবো বল, বড্ড হিসাবি। আমি অতোটা পারি না। যাক্, এবার তোর কথা বল্।
একটু হেসেই ফেললো ঝিনুক। সে হাসিতে কি ছিল না বুঝলেও, হাসির শেষে যে দীর্ঘশ্বাস নিল ঝিনুক, তা টের পেল কেয়া।
---- ভালোই তো ছিলাম...কিন্তু ইদানীং কেমন যেন সব এলোমেলো হয়ে গেল!
---- কেন, কি হল? শুনেছি তো শাশুড়ি নেই। ননদও নেই...
---- মিনষে তো আছে।
হেসে ফেললো কেয়া।
---- কি বললি, 'মিনষে'?  তা তোর 'মিনষে' আবার কি করলো?
---- প্রেম।... উনি আবার প্রেমে পড়েছেন।
---- ধ্যাত, কমলদা! এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে।
---- হলেও বলি, এটাই ঠিক। আর তারপর...
---- তারপর কী?
---- না, থাক।
---- আপত্তি থাকলে বলিস না।
---- না, তা ঠিক না। কি আর বলবো বল্, শেষটাই গায়েও হাত তুললো কমল!
---- এমা, তাই!
---- হ্যাঁ। আজ।
বিস্তারিত জানার পর কেয়া সহানুভূতির সুরে বললো, 'আরে, তাতে তুই এত আপসেট হয়ে পড়ছিস কেন বলতো! একটা 'টি-টোয়েন্টি' তুইও খেল না!'
---- মানে?
---- মানে আবার কি, এখন দিনকাল অনেক বদলে গেছে। সব জেনেশুনেও কাছুমাছু হয়ে ঘরের কোনায় বসে থেকে আসন সেলাইয়ের দিন নেই আর। ওকেও বুঝতে দে না কতটা কষ্ট তুই পেয়েছিস। একা একা কেন গুমড়ে মরবি! তোরও তো একটা জীবন আছে। পছন্দ-অপছন্দ, ভালোলাগা -মন্দলাগা আছে!
---- কী বলতে চাইছিস ?
---- বলছি, একটা বন্ধু খোঁজ ঝিনুক। দেখবি, তোর পরিচিত গণ্ডির মধ্যেই কাউকে পেয়ে যাবি; যে তোর অনুভূতিগুলো বুঝতে পারবে।
---- ইয়ার্কি মারিস না কেয়া।
---- আমি ইয়ার্কি মারছি না রে। সত্যি বলছি, এখন একজন বন্ধুর খুব দরকার তোর। যে তোর কথা ভাবে না, তুই-ই বা তার কথা ভেবে ভেবে কষ্ট পাবি কেন! তাছাড়া তুই উচ্চ শিক্ষিত, একটা কাজ ঠিক জোগাড় করে নিতে পারবি, দেখবি।.... তবে তপাই ছেলে মানুষ। ওকে কষ্টটা বুঝতে দিস না।'
---- এসব কোনও দিন স্বপ্নেও ভাবিনি কেয়া। এসব স্কুল-কলেজ লাইফে হলে বলতে পারতিস। এখন আমরা সংসারী। এসব ভাবাও তো পাপ!
---- পাপ? সংসার কি তোর একার না কি? সে তো এসব কিছু ভাবছে না!.... শোন, তুই ভালো থাকলে বন্ধু হিসেবে আমারও ভালো লাগবে। তাই বলা.... এই রে! 
---- কি হল?
---- আর বলিস না,  আমার ছোটছেলেটাতো এখন একা একাই পায়খানায় বসতে শিখে গেছে। কিন্তু পটি করার পর জলটা সেই আমাকেই ঢেলে দিতে হয়। পটি করে দাঁড়িয়ে আছে। ডাকছে। ভালো থাকিস, বুঝলি। পরে ফোন করবো। 
মোবাইলটা খাটের ওপর রেখে চুপ করে বসে থাকলো ঝিনুক। অনেকক্ষণ। ভাবছিল কেয়ার কথাগুলো। এটা ঠিক, কমলের সঙ্গে তার সম্পর্কটা আর আগের মতো নেই। জানে কমলও। এভাবে সম্পর্ক টেকে না। সত্যিই তো, সংসার তার একার নয়, কমলেরও। কি হবে এই মিথ্যে সম্পর্কটা আগলে রেখে! লোক দেখানো 'বরবউ' সেজে! 
ঝিনুক ভাবছিল তপাইয়ের কথাও। যদি সত্যিই একদিন তপাইকে সঙ্গে করে বেরিয়ে যেতে হয় এই সংসার থেকে, কিভাবে নেবে ও ব্যাপারটাকে? প্রথম প্রথম খুব কষ্ট পাবে নিশ্চয়। তারপর ধীরে ধীরে সব সয়ে যাবে। 
---- বউমা, দাদুভাইকে খাইয়ে দাও। ওর পেটে কিছু নেই। 
পেছন ঘুরে ঝিনুক দেখলো বাবা দাঁড়িয়ে। শুধু তো তপাই নয়, এই লোকটির কথাও তো তার ভাবা দরকার। বয়স হয়েছে তারঁ। হার্টের পেশেন্ট। তপাইকে তারঁ কোল থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেলে,  তিনি কি করে বাঁচবেন? তিনি তো একা! 
---- ও, বউমা, আজ কমল এলে আমি একবার তোমাদের সঙ্গে বসবো, বুঝলে! 
ঝিনুককে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই শুভেন্দুবাবু ধীরে ধীরে তারঁ শোওয়ার ঘরের দিকে পা বাড়ালেন।
শ্বশুর মশাইয়ের চলে যাওয়ার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ঝিনুক। ঋজুদেহ মানুষটাকে আজ কেমন ঝুঁকে চলতে দেখলো সে!
   
--------